২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি ফাইনালঃ শ্বাসরুদ্ধকর জয়ে চ্যাম্পিয়ন উইন্ডিজ

ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি ফাইনালঃ শ্বাসরুদ্ধকর জয়ে চ্যাম্পিয়ন উইন্ডিজ

0

নিউজবিডি৭১ডটকম
স্পোর্টস করেসপন্ডেন্টঃ ম্যাচের পরতে পরতে রুদ্ধশ্বাস নাটক, রোমাঞ্চ, শেষ ওভারের নাটকীয়তা। ফাইনালে উত্তেজনা ছড়ানোর সব উপকরণই থাকল পুরো ম্যাচজুড়ে। আর সেই উত্তেজনাপূর্ণ ফাইনালে শেষ ওভারের নাটকীয়তায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ হাসল শেষ হাসি।

রোববার কলকাতার ইডেন গার্ডেনে ইংল্যান্ডকে ৪ উইকেটে হারিয়ে দ্বিতীয় বারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

শিরোপা নির্ধারণী এই ম্যাচে আগে ব্যাট করে ৯ উইকেটে ১৫৫ রান করে ইংল্যান্ড। জবাবে শেষ ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৯ রান। বেন স্টোকসের প্রথম চার বলেই চারটি বিশাল ছক্কা হাঁকিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে অবিস্মরণীয় এক জয় এনে দেন কার্লোস ব্রাফেট।

তবে ব্রাফেট শেষ দৃশ্যের নায়ক হলেও দলের জয়ে বড় অবদান আসলে মারলন স্যামুয়েলসের। ক্রিস গেইল, লেন্ডল সিমন্স, জনসন চার্লস, আন্দ্রে রাসেল, ড্যারেন সামিরা যেখানে দুই অঙ্কই ছুঁতে পারেননি, সেখানে স্যামুয়েলস একপ্রান্তে বুক চিতিয়ে লড়ে গেছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি অপরাজিত থেকেছেন ৮৫ রানের অসাধারণ এক ইনিংস খেলে।

সুপার টেনে এই ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই ১৮৩ রান তাড়া করতে নেমে গেইলের ঝোড়ো সেঞ্চুরিতে ১১ বল আগেই জিতে গিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। সেক্ষেত্রে ফাইনালে ১৫৬ রানের লক্ষ্য ক্যারিবীয়দের জন্য খুব বড় হওয়ার কথা নয়। কিন্তু ফাইনাল বলে কথা। তাই তো ১৫৬ রান তাড়া করতে নেমে ১১ রান তুলতেই নেই ৩ উইকেট!

ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই জো রুটকে আক্রমণে এনেছিলেন ইয়ান মরগান। ব্যাটে হাতে কার্যকরী ৫৪ রানের ইনিংস খেলে ইংল্যান্ডকে লড়াইয়ের পুঁজি এনে দেওয়া রুট বল হাতেও দেখালেন জাদু। নিজের প্রথম তিন বলের মধ্যেই ফিরিয়ে দিলেন দুই ওপেনার জনসন চার্লস ও গেইলকে।

রুটের প্রথম বলে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে মিডঅনে বেন স্টোকসের হাতে ধরা পড়েন চার্লস (১)। দ্বিতীয় বলে চার মেরেছিলেন গেইল। কিন্তু পরের বলে তিনিও ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে লংঅফে ওই স্টোকসকে ক্যাচ দেন। সেমিফাইনালে ম্যাচজয়ী ৮২ রানের ইনিংস খেলা লেন্ডল সিমন্সও ফাইনালে ব্যর্থ। রানের খাতা খোলার আগেই ডেভিড উইলির বলে এলবিডব্লিউ হয়ে যান সিমন্স।

১১ রানেই ৩ উইকেট হারিয়ে তখন ভীষণ বিপদে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে চতুর্থ উইকেটে ডোয়াইন ব্রাভোকে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন মারলন স্যামুয়েলস। খুব বেশি বাউন্ডার মারতে না পারলেও রানের চাকা সচল রেখে ৪৭ বলে ফিফটি পূরণ করেন স্যামুয়েলস। এর পরেই ব্রাভোর বিদায়ে ভেঙে যায় ৭৫ রানের জুটি।

তখন জয়ের জন্য ৩৬ বল থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রয়োজন পড়ে ৭০ রান। লিয়াম প্লাঙ্কেটের করা ১৫তম ওভারে স্যামুয়েলসের দুই ছক্কা ও এক চারে আসে মোট ১৮ রান। তবে পরের ওভারে ডেভিড উইলি তিন বলের মধ্যে দুই হার্ডহিটার ব্যাটসম্যান আন্দ্রে রাসেল (১), ও ড্যারেন সামিকে (২) ফিরিয়ে দিয়ে ক্যারিবীয়দের রানের গতি কমিয়ে দেন। এ ওভারে আসে ৭ রান।

ক্রিস জর্ডানের করা পরের ওভারেও আসে ৭ রান। ফলে শেষ তিন ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রয়োজন পড়ে ৩৮ রান। ক্যারিবীয়দের একমাত্র আশা তখন স্যামুয়েলসকে ফিরেই। ১৮তম ওভারে আসে ১১ রান। অর্থাৎ শেষ দুই ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রয়োজন তখন ২৭ রান।

সেমিফাইনালে ডেথ ওভারে দারুণ বল এক করা জর্ডান ১৯তম ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৮ রানের বেশি তুলতে দেননি। ফলে শেষ ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রয়োজন পড়ে ১৯ রান। পারবে কি ওয়েস্ট ইন্ডিজ? পেরেছে ক্যারিবীয়রা। বেন স্টোকসের প্রথম চার বলে চারটি ছক্কা হাঁকিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে মহাকাব্যিক জয় এনে দেন কার্লোস ব্রাফেট।

২৩ বলে ৪ ছক্কা ও এক চারে ৩৪ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলে অপরাজিত থাকেন ব্রাফেট। ৬৬ বলে ৯ চার ও ২ ছক্কায় ৮৫ রানে অপরাজিত ছিলেন স্যামুয়েলস।

এর আগে টস জিতে ইংল্যান্ডকে ব্যাটিংয়ে পাঠায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ব্যাট করতে নেমে মাত্র ৮ রানের মধ্যেই দুই ওপেনারকে হারিয়ে বিপদে পড়ে ইংল্যান্ড।

ক্যারিবীয় স্পিনার স্যামুয়েল বদ্রির করা ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই বোল্ড হয়ে ফিরে যান জেসন রয় (০)। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালে এই প্রথম এত দ্রুত প্রথম উইকেট পড়ল। এর আগে ২০০৯ ও ২০১২ ফাইনালে পঞ্চম বলে প্রথম উইকেটের পতন ঘটেছিল।

ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে আন্দ্রে রাসেলের বলে বদ্রিকে ক্যাচ দিয়ে ফিরে যান অ্যালেক্স হেলস (১)। অর্থাৎ দুই ওপেনার মিলে করেন মাত্র ১ রান। এর আগে টি-টোয়েন্টিতে একবারই ইংল্যান্ডের দুই ওপেনার মিলে মাত্র ১ রান করেছিলেন, ২০০৯ সালে ম্যানচেস্টারে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে।

দুই ওপেনারকে হারানোর ধাক্কা সামলে উঠতে না-উঠতেই আরেকটি ধাক্কা খায় ইংল্যান্ড। বদ্রির স্পিন বিষে নীল এবার অধিনায়ক ইয়ান মরগান। ক্রিস গেইলকে ক্যাচ দেওয়ার আগে ইংলিশ অধিনায়কের ব্যাট থেকে আসে মাত্র ৫ রান।

শুরুতেই ৩ উইকেটে হারানোর পর তৃতীয় উইকেটে জো রুট ও জস বাটলার মিলে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এগারোতম ওভারে স্পিনার সুলেমান বেনকে পরপর দুই বলে সীমানার ওপারে আছড়ে ফেলেন বাটলার।

অবশ্য পরের ওভারেই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠা বাটলারকে ফিরিয়ে ৬১ রানের জুটি ভাঙেন কার্লোস ব্রাফেট। মাত্র ২২ বলে ৩ ছক্কা ও এক চারে ৩৬ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলেন বাটলার।

এরপর বেন স্টোকসকে সঙ্গে নিয়ে দলের স্কোর ১০০ পার করেন রুট। তিনি নিজে তুলে নেন ফিফটি। কিন্তু এর পরই মাত্র ১ রান তুলতেই দ্রুত ৩ উইকেট হারিয়ে আবার বিপদে পড়ে ইংল্যান্ড।

১৪তম ওভারের চতুর্থ ও শেষ বলে যথাক্রমে স্টোকস (১৩) ও মঈন আলীকে (০) সাজঘরের পথ দেখান ডোয়াইন ব্রাভো। পরের ওভারে ব্রাফেটের বলে ফিরে যান একপ্রান্ত আগলে রাখা রুট (৫৪)। ৩৬ বলে ৭টি চারের সাহায্যে ৫৪ রানের ইনিংসটি সাজান এই ডানহাতি।

শেষ দিকে ডেভিড উইলির ১৪ বলে ২১ ও ক্রিস জর্ডানের অপরাজিত ১২ রানের সুবাদে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৯ উইকেটে ১৫৫ রানের লড়াইয়ের পুঁজি পায় ইংল্যান্ড।

২৩ রানে ৩ উইকেট নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেরা বোলার কার্লোস ব্রাফেট। ডোয়াইন ব্রাভোও ৩ উইকেট নেন, তবে তিনি রান খরচ করেন ৩৭। এ ছাড়া স্যামুয়েল বদ্রি ১৬ রানে ২টি ও আন্দ্রে রাসেল ২১ রানে নেন একটি উইকেট।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ইংল্যান্ড: ২০ ওভারে ১৫৫/৯ (রুট ৫৪, বাটলার ৩৬, উইলি ২১; ব্রাফেট ৩/২৩, ব্রাভো ৩/৩৭, বদ্রি ২/১৬)।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ১৯.৪ ওভারে ১৬১/৬ (স্যামুয়েলস ৮৫*, ব্রাফেট ৩৪*, ব্রাভো ৩৪; উইলি ৩/২০, রুট ২/৯, রশিদ ১/২৩)।

ফল: ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৪ উইকেটে জয়ী।

নিউজবিডি৭১/এ আর/এপ্রিল ০৪, ২০১৬

image_print
Share.

Leave A Reply