কবিতাই আমার প্রিয় অনুসঙ্গ -পারভীন আমিন

নিউজবিডি৭১ডটকম

FB_IMG_1440671550391কবি পারভীন আমিন। জন্ম চট্টগ্রামে ১৯৬১ সালের ২৯ মে। স্বামী, দুই পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জননী পারভীন। কবিতা তার প্রিয় অনুসঙ্গ।  সব মিলিয়ে তাঁর কবিতাগ্রন্থের সংখ্যা মাত্র দুই। কবিতাগ্রন্থগুলো হয়েছে সমাদৃত, আদর
পেয়েছে অগ্রজ অনুজ কবিদের। শিশুসাহিত্যে ছিলেন সাবলীল। পাশাপাশি পারিবারিক জীবনকে কবিতায় রুপ দিয়েছেন সুন্দরভাবে। এছাড়া বন্ধুদের নিয়েও লিখেছেন তিনি। নবীন এ কবি ছিলেন গৃহিনী। প্রচারবিমুখ, স্বল্পপ্রজ এই কবির
ছন্দদক্ষতা ও বাকপ্রতিমা নির্মাণের অনন্যতা তাকে সুপরিচিত করেছে পাঠক মহলে।

তার সাক্ষাৎকারটি গ্রহন করেছেন শাহানাজ ইসলাম।

শাহনাজ ইসলাম: পারভিন আপা, বহুদিন থেকেই আপনার সাথে কথা বলার জন্য মুখিয়ে আছি। প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছি। শুরু করি। বলুন, কেমন আছেন?

পারভীন আমিন: ভাল আছি। সকলের দোয়ায়।

শাহনাজ ইসলাম: আপা, আপনি তো গৃহিনী ছিলেন। এতো কাজের মাঝে কবিতা লেখার প্রেরনা কোথায় পেলেন?

পারভীন আমিন: কাজকে বরাবর আমি ভালবাসি। স্কুলের বারান্দায় ভাল করে হৈহুল্লাড় করার অাগেই বিয়ে হয় আমার। মাধ্যমিকটা আর দেয়া হলো না। জমিদার বাড়ির কন্যা ছিলাম বলে আদারেরও কমতি ছিলনা। তার মাঝে শশুরবাড়িতে আসা। অল্প বয়সের বাচ্চা মেয়ে হলাম গৃহিনী। নানান কাজ সামাল দিতে রীতিমত হিমশিম খেতে হলো আমাকে। এরপরও অামি সংসারটা গুছিয়ে নেয় ধীরে ধীরে।

কিন্তু আমার শৈশবের সে লেখার কলম থেমে থাকে নি এক মুহুর্তের জন্য। সংসারের টুকিটাকি নানান কিছু তুলে ধরলাম লেখনিতে। এতে থাকলো প্রেম বিরহ শ্রদ্ধা। আসলে সংসারটাই যেন আমার কাছে বড় পৃথিবী লাগে। এতেই যেন মিশে আছে সবকিছুর মিশ্রন।

FB_IMG_1440671391362শাহনাজ ইসলাম: আপনি তো বড় হয়েছেন চট্টগ্রামে। পাকিস্তান আমল, স্বাধীন বাংলাদেশ দেখেছেন। আপনার শৈশবটা কেমন ছিলো? ছেলেবেলার কোন ঘটনা কী মনে আছে আপা?

পারভীন আমিন: আট দশটা দুরন্ত ছেলের শৈশবের মতোই ছিলো আমার গ্রামীণ শৈশব। আমার কবিতায় আমি সেসব বর্ণনা দিয়েছিও। শৈশবের অনেক ছোট ছোট স্মৃতির কথা লিখেছি।

শাহনাজ ইসলাম: আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ তো বেরুলো একুশে বই মেলায়। প্রথম বইটি নিয়ে কিছু বলেন?

পারভীন আমিন: লিখতে ইচ্ছে হলো। অনুপ্রেরণা পেলামও বলা যায়। আমি প্রথম লিখি যে কবিতা সেটা কয়েক বছর পরই নষ্ট করে ফেলি। কিছুই হয়নি ভেবে। বই অনেক পরে হল, হয়তো আরো পরে হতো। এর একটা কারণ আমি খুব খুঁতখুঁতে, প্রচুর পরিমার্জন করি। তবে যা লিখেছি তাতে আন্তরিকতা ছিল। চলার পথে কোন ভয় বা অনুকম্পাকে সঙ্গী করিনি আমি। খুব সহজভাবে জীবনের অনুভূতির কথাগুলোই লিখতে চেয়েছি, এবং মূলত বেদনাই লিখেছি।

শাহনাজ ইসলাম: প্রযুক্তি এখন একটি বড় ভূমিকা রাখছে অাপা। আপনি প্রচণ্ডভাবে এসবের বাইরে। ফোন ছাড়া এমনকী ইমেইল-ও নাকি ব্যবহার করেন না। প্রযুক্তির কারণে সাহিত্য কি বিশেষ কোন সুবিধা বা অসুবিধার মুখোমুখি
হচ্ছে বলে মনে করেন? প্রযুক্তির কারণে মানুষের আনন্দক্ষেত্র অনেক বেড়ে যাওয়ায় মানুষ কম কবিতা পড়ছে এমন মনে করেন?

পারভীন আমিন: আমি তা মনে করি না। প্রযুক্তি যতই বিকাশ লাভ করুক সাহিত্য তার জায়গায় অনড়। ইন্টারনেটে বই পড়া যায় হয়ত; কিন্তু একটা ছাপানো বই পড়ায় যে আনন্দ তা ইন্টারনেট দিতে পারে না। আমি অভ্যস্ত হতে পারিনি, সামর্থ্যও হয়তো নাই, এজন্য ব্যবহারও করি না। কিন্তু আমি মনে করি প্রযুক্তির ইতিবাচক দিকও আছে। প্রচুর মানুষ প্রযুক্তির কল্যাণে হয়তো তোমার আমার কবিতা পড়তে পারবে ভবিষ্যতে। এসব কম সুবিধা তো না। আর যে কবিতার পাঠক, কবিতার মজা যে জানে, সে কবিতা পড়বেই। অন্য যত আনন্দক্ষেত্রের কথাই তুমি বলো না কেনো! পৃথিবীতে যত শিল্পমাধ্যম আছে তার মধ্যে কবিতাই শ্রেষ্ঠতম, এটা শুধু আমার কথাই না, পৃথিবীর বড় বড় মনীষীরা বলে গেছেন।

শাহনাজ ইসলাম: আপা সাহিত্যে ও নতুন কবিদের নিয়ে কিছু বলেন?

পারভীন আমিন: তোমার সাথে আমি একমত। অবশ্যই লেখক সাহিত্যিকদের দায় রয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ভালো বই একেবারেই কমে আসছে। যা আসছে তাও ভুলে ভরা ও অসম্পাদিত। একটা ভালো বই পাঠককে আকৃষ্ট করবেই। কাজেই ভালো বই বেশি বেরুলে বর্তমান প্রজন্ম না কেবল, সকলেই তাতে আনন্দ খুঁজে পেতে বাধ্য। লেখক হিসেবে লেখকদের এই চ্যালেঞ্জটা নিতে হবে, শুধু নিজের জন্যে না, পাঠকদের কথা মাথায় রেখেও তাই লিখতে হবে। আমার সহজের সাধনা করার এটাও একটা কারণ। আমি চেয়েছি আপামর, অজটিল সাধারণ মানুষ আমার কবিতা পড়ে অনুভূতিতে কম্পন টের পাক।

শাহনাজ ইসলাম: আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় অতৃপ্তি কোনটিকে মনে করেন?

পারভীন আমিন: অতৃপ্তির জায়গা বলতে যাদের বেশি ভালবেসেছি তাদের কাছ থেকেই দু:খ পেয়েছি।

শাহনাজ ইসলাম: আপনার জীবনে প্রেমের ভূমিকা কেমন?

পারভীন আমিন: প্রেমই আমাকে কবিতা লিখিয়েছে এ কথা বলতে পারি। পৃথিবীতে কবিতা লেখার হাজারো বিষয় থাকতে পারে, কিন্তু প্রেম, প্রেমের বেদনা, প্রিয়ার জন্য অপেক্ষা নিয়ে যে কবিতা তার চেয়ে মহৎ আর কিছু হতে পারে না। আমি এ বয়সে এখনো প্রেমের প্রস্তাব পাই। বেশ অবাক লাগে। বয়সতো আর থেমে নেয় তাই আর প্রেম করা হয় না।

শাহনাজ ইসলাম: দাদা কী প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন? এখনো প্রেম করে চলেছেন?

পারভীন আমিন: তোমাদের ভাইয়ার সাথে আমার বিয়েটাকে ঠিক প্রচলিত প্রেমের ছাঁচে ফেলা যাবে না। তবে প্রেম তো করেছি, করছি বটেই। নইলে এত বছর অপ্রেম নিয়ে বাঁচতে পারতাম না। আমি প্রতিদিনই নতুন প্রেমিক, একটি কবিতার জন্য।

শাহনাজ ইসলাম: একটি ডাকে উড়েছিলাম তোমার চোখের অসীম নীলে,/সেখানে ঝড়, মেঘের ঘটা- তুমি কি তা বলেছিলে? আপনার এমন হাজারো পংক্তি ঘুরেছে মানুষের মুখে মুখে। আবৃত্তিশিল্পীরা প্রচুর পড়েছেন মঞ্চে মঞ্চে। কবি হিসেবে নিজেকে সফল মনে করেন?

পারভীন আমিন: আমি সফল কী না কবি হিসেবে এটা আসলে অন্যরা বলবে। আমি চেষ্টা করেছি প্রতিটি কবিতার জন্ম দিতে নির্ভুল ছন্দে, আমার সামর্থ মতোন যথাসম্ভব সুন্দর বাক্যে। আমার বন্ধুরা বিভিন্ন সময় বলেছে এজন্য আমার কবিতার একটা বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে। আমাদের এখানে সাহিত্যের সমালোচনা খুব ভালো কখনো যদি দাঁড়ায়, তবে হয়তো আমার কবিতা নিয়ে একটা বিশ্লেষণ কেউ করবে। তবে মানুষ হিসেবে আমি বোধহয় সফল নই, অনেক প্রিয়জনেরই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারিনি, যেসব আমার পূরণ করতে পারা উচিত ছিল।

শাহনাজ ইসলাম: আমি তো আপা একটু আধটু কবিতা পড়ার চেষ্টা করি। আমি যেটুকু আপনার কবিতা পড়েছি, তাতে আমার মনে হয়,ছন্দের দোদুল্যমানতাকে হাতের মুঠোয় নিয়েও যে চিন্তার আকাশ মেলে ধরা যায় কবিতায়, তার এক অভিনব নিরীক্ষা খুবই সফলভাবে করেছেন আপনি।

পারভীন আমিন: কবিতা লিখতে এসে অনুপ্ররনা পেয়েছি। নতুন নতুন বন্ধু পেয়েছি। ভালবাসা পেয়েছি। আশপাশের মানুষের কাছে। তবে নিজের লাঞ্ছনা ব্যাথা কষ্ট গুলো তুলে ধরার চেষ্টায় ছিল আমার কবিতায়।

শাহনাজ ইসলাম: এ সময়ের তরুণদের লেখা পড়েন? কাদের লেখা ভালো লাগে? কেনো লাগে?

পারভীন আমিন: তরুণদের লেখা খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ার চেষ্টা করি। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হোঁচট খাই। কেউ কেউ ভাষার প্রয়োগ বিধি, ছন্দ ইত্যাদি না জেনেই লিখছে। ভাষা সম্বন্ধে ভালোভাবে না জানলে নির্ভুল গদ্য বা পদ্য কোনটাই লেখা সম্ভব নয়। ভালো ভালো বই পড়লে ভালো লেখা বেরিয়ে আসবে। আবার কেউ কেউ দেখি ভাষাটাকেই পাল্টে দিচ্ছে। ভাষা পাল্টে দেয়া খারাপ নয়, কিন্তু বিকৃত করে ফেলাটা অপরাধ। কবি খুব ইনফ্লুয়েন্সিয়াল, ভাষার অভিভাবক বলি আমরা কবিদের। কবি যখন একটা শব্দ ব্যবহার করেন তখন তার ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। সেই শব্দটা সাধারণ মানুষ তখন ব্যবহার করেন। আশি নব্বইতে একধরনের কবিরা চেষ্টা করেছেন ভাষাটাকে কলুষিত করতে। তারা বিভ্রান্তিমূলক বানানরীতি ঢুকিয়ে দিয়েছেন স্বৈরাচারের মত।

রফিকও তো (রফিক আজাদ) সঙ্গমের আঞ্চলিক যে প্রায়োগিক শব্দটি আছে তা ব্যবহার করেছেন, কিন্তু খুবই শিল্পসম্মতভাবে। এখন অনেকেই কবিতা কি তা না বুঝেই যাচ্ছে তাই লিখছেন। এটা সবসময়ই ছিলো অবশ্য। তবে আমার ব্যক্তিগত মতের কথা যদি জানতে চাও, ন্যূনতম নান্দনিকতার কথা মাথায় না রেখে যারা বাংলার মতো সুন্দর ভাষাটাকে কলুষিত করছে তাদের আমার হত্যা করতে ইচ্ছে করে।

শাহনাজ ইসলাম: বিশেষ কাউকে কী ইঙ্গিত করছেন দাদা?

পারভীন আমিন: হ্যাঁ, তা বলতে পারো। মানুষের শ্রদ্ধা পাওয়ার মত অনেক কাজই হয়ত তারা করেছেন কিন্তু তারা লেখা পড়া জানেন না। তাদের ছাপানো বই ভুলে ভরা। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা তারা অন্যের লেখা ছেপে দিয়েছেন নিজের নামে, এমনকী কৃতজ্ঞতা স্বীকার না করেই। একটা দেশের একজন জাতীয় অধ্যাপক যদি এমন হন, চৌর্য্যবৃত্তির গুণে গুণান্বিত হন, সে দেশের তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা হয়।

শাহনাজ ইসলাম: আপনাদের পরে যারা লিখতে এলো তাদের জন্য কী বলবেন?

পারভীন আমিন: কবিত্ব না থাকলে কবিতা লেখা যায় না। তবে ভাষার প্রয়োগবিধি, ছন্দ ইত্যাদি না জানলে কবিত্ব থাকা সত্ত্বেও কবিতা পূর্ণতা পায় না।ছন্দকে অস্বীকার করতেও ছন্দ জানা প্রয়োজন। আমরা একসাথে কয়েকজন ভালো কবিতা
লিখেছি, তাই তোমাদের মুখে এই চল্লিশ বছর পরে এসে ষাটের দশক ষাটের দশক শুনি। আমি কখনো সংঘে ছিলাম না তেমন, কিন্তু এখন মনে হয় ভালো কবিতার জন্য সংঘ জরুরী। একদশকে সংঘ ভেঙে যায় হয়তো, শঙ্খ ঘোষের কবিতা, কিন্তু তবুও কবিদের সংঘ করা দরকার। একজন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বা একজন সিকানদার আবু জাফর না থাকলে ষাটের দশক ষাটের দশক তোমরা করতে না এখন। উনাদের অবদানের কারণেই ষাটের দশকের এতজন ভালো কবিকে পেলো বাংলা কবিতা।

শাহনাজ ইসলাম: কবিতা ছাড়া আপনার বেঁচে থাকার আর কোন প্রেরণা রয়েছে আপা?

পারভীন আমিন: আশাবাদ, কখনও নৈরাশ্যবাদী নই আমি। কাল ভোরবেলা সকালের আলো যখন পড়বে পৃথিবীতে সে মুহূর্তটি দেখার জন্য আজ রাতে ঘুমুতে যাবো আমি।

শাহনাজ ইসলাম: অাপনার নতুন বই প্রেমাত্মা নিয়ে কিছু বলবেন কি?

পারভীন আমিন: এই বইয়ে ৩৬টি কবিতা রয়েছে। যাতে চেষ্টা করেছি কিছু নতুনত্ব দেওয়ার জন্য। এর মধ্যে একুশের প্রভাত ও বালিকা বধূসহ কয়কটিতে নিয়ে এসেছি নানান ছন্দ। লিখেছি নাতী নাতনী সন্তান সমাজসহ নানান মানুষকে নিয়ে। প্রতিটি কবিতায় একটু মানুষ সম্পর্কে বুঝানোর চেষ্টা করেছি।

শাহানাজ ইসলাম: অাপনার নতুন বই প্রেমাত্মার কাব্য একুশের প্রভাত নিয়ে কিছু বলুন।

পারভীন আমিন:
সকাল বেলা গেলাম একুশের
কবিতা গুচ্ছ উৎসবে,
সেখানে পেয়ে গেলাম এক যুবরাজ
সে আমার হাতে এক ফুলের গুচ্ছ দেখে।
ফুল্কে সাধুবাদ না দিয়ে
সে আবিষ্কার করলো মালিনির সৌন্দর্য।

এ কবিতার মাঝে আমি ফুটিয়ে তুলেছি একজন কবির প্রতি ভক্তের ভালবাসার বহি:প্রকাশ।

শাহানাজ ইসলাম: আপনাকে বিরক্ত করলাম আপা।

পারভীন আমিন: ধন্যবাদ তোমাকে আমাকে বিরক্ত করতে করতে কিছু ভালো সময় উপহার দেবার জন্য। হ্যা হ্যা ভালো থেকো। নিউজবিডি৭১ ডটকমকেও ধন্যবাদ।

নিউজবিডি৭১/জে এইচ/২৭ আগস্ট ২০১৫