[english_date] উনিশে প্রতিবেশী দুই দেশে প্রধানমন্ত্রী দুই বাঙালি!
Mountain View

উনিশে প্রতিবেশী দুই দেশে প্রধানমন্ত্রী দুই বাঙালি!

0

বাহার উদ্দিন
শেখ হাসিনার নতুন মন্ত্রিসভায় নবীনের জয়, সামাজিক সাম্য আর জনপ্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য দেখে আমরা আপ্লুত। খানিকটা আশ্বস্ত। আশা করছি, পশ্চিমবঙ্গের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নেতৃত্বও নিকট ভবিষ্যতে উপমহাদেশকে অনুরূপ রাস্তা দেখাবে। লক্ষণ পরিষ্কার। রাজনীতির ভেতরে ও বাইরে এ রকম জোর চর্চা শুরু হয়েছে, দিল্লিতে আমরা এবার বাঙালি প্রধানমন্ত্রী দেখতে চাইছি! এটা ব্যক্তিবিশেষের নয়, কোনো একটি দলের নয়, দেশভাগে খণ্ডিত, ক্ষতবিক্ষত সমগ্র জাতিসত্তার ইচ্ছা।

সমাজ যখন দাবি তোলে আর এ দাবির পেছনে ইতিহাসের সায় থাকে তখন দাবিটি সর্বসম্মত ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। নব্বইয়ের দশকে একটি সুযোগ এসেছিল, ভারতীয় রাজনীতি—জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী করতে চাইল। তাঁর দল রাজি হয়নি। দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। দলের ইচ্ছাকে মেনে নিয়েছিলেন প্রাজ্ঞ নেতা। সিপিএমের ওই ঐতিহাসিক ব্লান্ডারের ক্ষত আজও শুকায়নি। পরে খানিকটা প্রশমিত হয় প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মাধ্যমে। প্রণববাবু প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও প্রমাণিত করে দিলেন রাষ্ট্রপতির আসনে তাঁর দক্ষতা, তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা কী গভীর! ভারতের প্রথম নাগরিক হয়ে উঠলেন বিশ্বনাগরিক। সক্রিয় রাজনীতি আর দেশপ্রধানের পদ থেকে অবসরগ্রহণের পরেও আমরা দেখতে পাচ্ছি, বয়স তাঁর ফ্যাক্টর নয়। তরতাজা কণ্ঠস্বর। সব সময় ছুটছেন। বারবার দেশকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন সহিষ্ণুতা, মিশ্র সংস্কৃতি আর বহুত্ববাদের পরম্পরা। সাবেক হয়েও অসাবেক, প্রাসঙ্গিক হয়ে আছেন।

আমাদের বিশ্বাসে বিলকুল সংশয় নেই, বাঙালি দিল্লির কুরসিতে যাঁকে দেখতে চাইছে, দেখতে চাইছে ফেডারেল ভারত, রাজ্যপরিচালনায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত সাফল্য দেশের নেতৃত্বেও অন্য রকম সম্ভাবনা তৈরি করবে। এ নিছক স্বপ্ন নয়, হয়তো বা ভবিষ্যতের বাস্তব। ইতিহাসেরও অলিখিত নির্দেশ। এ নির্দেশ কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখনো অস্পষ্ট। কিন্তু তার যে রূপরেখা ফুটে উঠেছে, তা আশা আর প্রত্যাশাকে ক্রমাগত উঁচু করছে। কী এই প্রত্যাশা? একই সময়ে প্রতিবেশী দুই দেশে নারীরা আত্মশক্তির প্রতীক দুই বাঙালিকে গণদেবতা সর্বোচ্চ কুরসিতে দেখার দাবি তুলছে। এই দাবি আর স্বপ্নের সঙ্গে উপমহাদেশের সামাজিক ইচ্ছার একটুকুও বিরোধ নেই।

বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার তৃতীয় প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন ছিল না। জিতবেন, চমক দেবেন, বিভেদকামী বিরোধীদের সব মতলব ভেস্তে যাবে—এ বিশ্বাস আমাদের ছিল। বৈষম্য, পরিকল্পিত অন্যায়, দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসের তিক্ত বিষাক্ত অভিজ্ঞতা অতিক্রম করে তাঁর নিরঙ্কুশ জনপ্রিয়তা সুস্থাপিত হয়ে উঠবে, গত পাঁচ বছরে বারবার এ প্রমাণ মিলেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোট হয়নি। ভোটের নামে প্রহসন হয়েছে। অভিযোগটির সত্যতা কোথায়? ভোট প্রয়োগের লাইনে এত লোক কোত্থেকে এলো? ভোটের দিন জামায়াত তার প্রার্থীদের কেন প্রত্যাহার করে নিল? বিএনপি জনতার স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাস দেখে ঘাবড়ে গেল কোন কারণে? কারা বুথে বুথে হিংসা ছড়িয়ে আওয়ামী লীগ কর্মীদের খুন করল? বিদেশি পর্যবেক্ষকরা র‌্যাগিং নিয়ে কেন অভিযোগ তুললেন না? ভোটের ফলাফল দেখে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম কী কারণে বলল, এই জয় উন্নয়নের। এই জয় শেখ হাসিনার সন্ত্রাসবিরোধী সাফল্যের। এই জয় তারুণ্যের মহাশক্তির।

মাস তিনেক আগে প্রণববাবু আমাকে বলেছিলেন, ভারতে দ্বিতীয় ইউপিএ সরকার গঠনের আগে, প্রাক-নির্বাচনী প্রস্তুতিতে কংগ্রেস তার প্রার্থী তালিকায় তরুণদের গুরুত্ব দেয়। এতে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার (অ্যান্টি-ইনকামবেন্সির) ঝোঁক থমকে যায়। আমরা সফল হই। শেখ হাসিনা সমরূপ মনোভাব গ্রহণ করলে আওয়ামী লীগ আবার ফিরবে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের স্থিতি বাড়বে। ক্রমেই পরিণত হয়ে উঠবে। দিল্লিতে বিজেপির একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ বংলাদেশের শুভানুধ্যায়ী মন্ত্রীও এই লেখককে এ আভাস দিয়ে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের ঘরোয়া রাজনীতি নিয়ে আমরা নাক গলাব না। তবে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় তারুণ্যকে শেখ হাসিনা যদি গুরুত্ব দেন, তাঁর জয় সুনিশ্চিত। প্রার্থী মনোনয়নে শেখ হাসিনা রিস্ক নিয়েছেন। নব প্রজন্মের প্রতিনিধিদের টিকিট দিয়ে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন, তাঁদের হাতেই দেশ গড়ার ভবিষ্যৎ দায়িত্ব তুলে দিতে তিনি অঙ্গীকারবদ্ধ।

নতুন মন্ত্রিসভা গঠনেও হাসিনা তাঁর অব্যক্ত আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করলেন। জানিয়ে দিতে চাইলেন, দেশ এগোচ্ছে। তারুণ্যের সংকল্প, সংকল্পের সুভাষিত জেদ আর লড়াকু মনোভাব তাঁর ভরসা। এখানে তিনি অখণ্ড বাঙালির দিনযাপন ও মননের আপসহীন অনুসারী। জাতির আবহমান ঐতিহ্যের নিভৃত, ঘোষিত সাধক। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও সমগোত্রীয় স্বপ্নদর্শী।

বিষয়টি হাসিনার মন্ত্রিসভার নতুন চেহারার পরিসংখ্যান পেশ করে একটু বিশদভাবে বলা দরকার। মন্ত্রী হয়েছেন ৪৭ জন। নতুন মুখ ৩১। বাদ পড়েছেন আগের ৩৪ মন্ত্রী। পূর্ণমন্ত্রী ২৪। নতুন মুখ ৯। রাষ্ট্রমন্ত্রী ২৪। এঁদের ৯ জন ঝকঝকে তরুণ। হিন্দু মন্ত্রী দুই, উপজাতি প্রতিনিধি একজন। যতদূর খবর পাচ্ছি, মন্ত্রীর সংখ্যা আরো বাড়বে। শরিকদের আলোকিত মুখগুলো সামনে নিয়ে আসা হবে।

শুরুতে শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সামাজিক সাম্য ও ভারসাম্য সম্পর্কে যে কথা বলেছি, তার সততা আশা করি আরো বেশি প্রশস্ত হবে। হাসিনার মনের ভাষা দূর থেকে পড়ার সুযোগ হচ্ছে। হাসিখুশির দিলদরাজ মহিলা। স্বভাবে নরম। প্রয়োজনে কঠোর। দুর্ভেদ্য তাঁর সিদ্ধান্ত, দায়বদ্ধতা যুক্তিময় আর সুদূরপ্রসারী। ছোট্ট একটি দৃষ্টান্ত পেশ করতে ইচ্ছা করছে। সিরাজগঞ্জের একটি তরুণীকে কয়েক বছর আগে গণধর্ষণ করে এক দল দুর্বৃত্ত। হাসিনা তখন বিরোধীদলীয় নেতা। মেয়েটির সঙ্গে, পরিবারের সঙ্গেও দেখা করলেন। তাঁর লেখাপড়ার, তাঁর পরিবারের কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেই তুলে নিলেন। মেয়েটিও অসাধারণ, এমবিএ করেছে। চাকরি করছে বড় সংস্থায়। তাঁকে ভারতে চলে আসার টোপ দেওয়া হলো। মাথা উঁচিয়ে বলল, ‘মাতৃভূমি ছাড়ব না। এখানে জন্মেছি, এখানেই থাকব।’ অন্ধকারে পূর্ণিমার আলো ছড়িয়ে মেয়েটি যে দেশপ্রেম, যে দুঃসাহসের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, তাকে যেভাবে শেখ হাসিনা সস্নেহে গড়ে তুললেন, বানিয়ে দিলেন সুবিচারের দৃষ্টান্ত, তা একটি ইতিহাস। ইতিহাসের এই বৃহত্তর প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি ঘটল বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রীর নতুন মন্ত্রিসভায়ও। আমরা আশান্বিত, উদ্বুদ্ধ। মুজিবকন্যা গড়ে তুলতে চাইছেন নেতৃত্বের ভবিষ্যত্মুখী এমন এক গোষ্ঠী—যারা সাম্য, সামাজিক পছন্দকে গুরুত্ব দেবে, বাঙালির চিরায়ত সৌহার্দ্যকে, জাতিসত্তার ইচ্ছা আর বিজয় নিশানকে তুলে ধরবে বিশ্বের দরবারে। দিনগুলো আসছে। সম্মুখে হাঁটছে। আমাদের বাংলায়, আমাদের আসামে, আমাদের মহাভারতেও বেজে উঠছে সমবেত সংকেতের শঙ্খধ্বনি।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, আরম্ভ। সম্পাদক, সর্বভারতীয় দৈনিক যুগশঙ্খ

জানুয়ারি ১৪, ২০১৯

Share.

Comments are closed.