১৭ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং গনহত্যার স্মৃতি কথা ১৯৭১: সোনারগাঁয়ের সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র
Mountain View

গনহত্যার স্মৃতি কথা ১৯৭১: সোনারগাঁয়ের সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

0
image_pdfimage_print

মাহফুজুল ইসলাম হায়দার
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।তিনি তার সংগ্রাম মুখর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ব্যয় করেছিলেন একটি স্বাধীন, সার্বভৌম বাঙালি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়। তাঁর জীবনের অনেক খানি সময় কেটেছে জেলখানার অন্ধকার ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে বাঙালির ক্ষুধা, দারিদ্র্য, শোষণ ও নির্যাতন থেকে মুক্তির প্রতিক্ষায়।চির সবুজ, সুখ-শান্তিতে সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার এক অদম্য আকাংখা ও প্রত্যাশায়।

বঙ্গবন্ধু যখন ১৯৬৬ সালে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ‘বাংলার মুক্তির সনদ’ নামে পরিচিত ৬ দফা আন্দোলনের ডাক দিলেন।সারা বাংলায় এই ৬ দফা দাবির প্রতি অভূতপূর্ব জনসমর্থন ও গণজোয়ারের সৃষ্টি হয়।পাকিস্তান সরকার এই দাবির প্রতি তীব্র জনসমর্থন ও গণজোয়ার দেখে চরমভাবে ভীত হয়ে পড়ে।বঙ্গবন্ধু ও বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন কে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য পাকিস্তান সরকার ঘৃণ্য এক যড়যন্ত্রে মেতে ওঠে।১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধু ও অপর ৩৪ জনকে ‘আগরতলা যড়যন্ত্র মামলা’ নামক মিথ্যা মামলার আসামি করা হয়।

পাকিস্তান সরকারের এই ছলচাতুরী বাংলার শোষিত নিষ্পেষিত জনগণের বুঝতে খুব একটা দেরী হয়নি।বাংলার জনগণ মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যূত্থান শুরু করে ও চূড়ান্ত বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ফলে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার পিছু হটে এবং মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাংলার জনগন ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও তার দল আওয়ামীলীগের প্রতি নিরঙ্কুশ জনসমর্থন প্রদর্শন করে।নির্বাচনে জয়লাভ করলেও পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুর নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করতে নানা ধরনের টালবাহানা শুরু করে।জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করে মিথ্যা অজুহাতে তা স্থগিত করা হয়।বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবে আর বাঙালিরা পাকিস্তান শাসন করবে এটা হানাদার পশ্চিম পাকিস্তানিরা কোনদিনই মন থেকে মেনে নিতে পারেনি।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা কামী বাঙালিদের উদ্দেশ্যে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বজ্রকন্ঠে ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”।তিনি আরো বলেন, আমার অনুরোধ প্রত্যেক গ্রামে, মহল্লায়, ইউনিয়নে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলুন। যার হাতে যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালো রাত্রিতে বর্বর পাকবাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায় এর পাশাপাশি ‘অপারেশন সার্চলাইটের নামে’ ঢাকা শহরে ইতিহাসের ঘৃণ্যতম গণহত্যায় মেতে ওঠে।রাত পেরিয়ে দিনের আলো যখন ফুটে ওঠে তখন দেখা যায় চারিদিকে শুধু গুলি খাওয়া ছিন্নভিন্ন নিথর মৃতদেহ পড়ে আছ।বাতাসে বারুদের উল্লাস আর রক্তের পঁচা গন্ধ।কারো হাত নেই, কারো পা নেই।কারো বা মাথার খুলি উড়ে গেছে।

যেখানেই চোখ পড়ে সারা শহরে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ।যারা বেঁচে ছিলেন তাদের চোখে মুখে অজানা আতংক।ভয়াল মৃত্যুর বিভীষিকা।নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এবং জীবন বাঁচাতে ঢাকায় বসবাসকারী হাজার হাজার মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে পালাতে শুরু করে।ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কে পাক বাহিনীর টহল এবং চলাচল ঝুঁকি পূর্ণ হওয়ায় এইসব মানুষ হেঁটে তুলনামূলক নিরাপদ গ্রামের দিকে আসতে শুরু করে।এমনি বহু মানুষ এসে আশ্রয় নেয় সোনারগাঁয়ের সনমান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি আশ্রয় কেন্দ্রে।

সিরাজ মাস্টারের নেতৃত্বে ও তৎকালীন সনমান্দী গ্রামের সচেতন যুব সমাজের উদ্যোগে নারী ও শিশু সহ সকল শরণার্থীদের জন্য খাদ্য,পানীয়, নিরাপত্তা এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়।পরবর্তীতে সনমান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই আশ্রয়কেন্দ্রটিকে ঘিরেই গড়ে তোলা হয় সোনারগাঁয়ের সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষনের পর সমগ্র বাংলাদেশে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। সেদিন অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারনে সনমান্দী গ্রামটি পিছিয়ে থাকলেও এই গ্রামের তরুণ ও যুব সমাজ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ডাকে সাড়া দিতে এতটুকু কার্পণ্য বোধ করেনি বরং তারা বীরদর্পে এগিয়ে আসে।
মহান নেতার আহবানে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে অভাগিনী বাংলা মায়ের মান ইজ্জত রক্ষায় তারা এক একজন অসম্ভব সক্রিয়, চির জাগ্রত অতন্দ্র প্রহরী হয়ে ওঠে।

১৯৭১ সালের মধ্য এপ্রিলে সনমান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘সনমান্দী গ্রাম সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনের উদ্দেশ্যে গ্রাম পঞ্চায়েতের এক সভা আহবান করা হয়।সেদিন শুধু প্রাণভয়ে প্রবীন পঞ্চায়েত প্রধানদের অনেকেই সংগ্রাম পরিষদের সভাপতির গুরু দায়িত্বভার বহনে অপারগতা এবং অক্ষমতা প্রকাশ করেন।সেই সময় এগিয়ে আসেন অস্ত্র চালনায় অভিজ্ঞ ও অস্ত্র প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত অকুতোভয় এক সৈনিক।

গোপালগঞ্জসহ বৃহত্তর ফরিদপুর ও শরিয়তপুরের ডামুড্যায় পুলিশ বাহিনীতে হাবিলদার পদে চাকুরীকালীন সূত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যে ধন্য এবং পরবর্তীতে সোনারগাঁও সাব-রেজিস্ট্রেশন অফিসের বিশিষ্ট দলিল লিখক আবুল হাসেম মোল্লা। সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক আবুল হাসেম মোল্লাকে সনমান্দী গ্রাম সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।

পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের পর সোনার গাঁ থানার তৎকালীন সংগ্রাম পরিষদের নির্দেশে কৃষক, শ্রমিক, যুবক, ছাত্র ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।৭ জুন ১৯৭১ সালে সোনার গাঁ থেকে প্রথম মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল প্রশিক্ষন গ্রহনের জন্য ভারতে যায়।প্রশিক্ষন শেষে সোনার গাঁ থানা কমান্ডার আঃ মালেকের নেতৃত্বে ১১ জনের একটি দল ৬ আগস্ট রাতে সনমান্দী গ্রামে ফিরে আসে।

সেই সময় নারায়ণগঞ্জ মহকুমার বৈদ্যের বাজার থানার অন্তর্গত সনমান্দী গ্রাম ছিল প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও আদর্শ স্থান।সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন এলাকার অনেক ছাত্র ,কৃষক, যুবক ও তরুন ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য প্রাণপণে চেষ্টা চালায়।পাক বাহিনীর কড়াকড়ির জন্য সীমান্ত পেরুতে না পেরে অনেকেই আবার সোনারগাঁয়ে ফিরে আসে।

এরই মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ভারতে যাওয়া কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ভারত থেকে অস্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে সোনারগাঁয়ে ফেরত আসে।এই ভারত ফেরত মুক্তিযোদ্ধাদের পরামর্শক্রমে সনমান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

পরবর্তীতে ২নং সেক্টর কমান্ডার মেজর এ,টি,এম হায়দার এর অনুমোদনক্রমে, ৬দফা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও সোনার গাঁ থানা সংগ্রাম কমিটির সমন্বয়ক সুলতান আহমেদ মোল্লা বাদশা ৩১ আগস্ট ১৯৭১ এ আনুষ্ঠানিকভাবে সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি উদ্বোধন করেন।

মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পৃষ্টপোষকতায় ছিলেন থানা কমান্ডার আঃ মালেক। উপদেষ্টা ছিলেন সুলতান আহমেদ মোল্লা (বাদশা) এবং কেন্দ্র প্রধান (ইনচার্জ) হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন মোঃ সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ মাস্টার)।

সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রথম পর্যায়ে সনমান্দী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মোঃ সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ মাস্টার), মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার আবু জাফর, মুক্তিযোদ্ধা মোসলেহ উদ্দিন মোল্লা, মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ, মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা খালেক বিন তোরাব, মুক্তিযোদ্ধা বেলায়েত হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা, মুক্তিযোদ্ধা সুরুজ মিয়া, মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা ইলিয়াস, মুক্তিযোদ্ধা ইজ্জত আলী, মুক্তিযোদ্ধা বাচ্চু মিয়া, মুক্তিযোদ্ধা আ : আজিজ, মুক্তিযোদ্ধা তাহের আলী প্রমুখ কৃতি সন্তান সহ আরো অনেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

এ সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আঃ মতিন, মুক্তিযোদ্ধা মোশারফ হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা টু আই সি হাবিবুল্লাহ, মুক্তিযোদ্ধা রেহাজ আলী এবং মুক্তিযোদ্ধা আঃ কাদির।

এখানে থ্রী নট থ্রী রাইফেল, এস এম জি চালনা এবং হ্যান্ড গ্রেনেড ছুঁড়ে মারা, রাইফেল বা অস্ত্রহাতে ক্রলিং, গেরিলা আক্রমনের বিভিন্ন কৌশল ও পদ্ধতি, গোপণে কিভাবে পাক বাহিনীর যাতায়াতের খবরা খবর আদান প্রদান ও গোয়েন্দা নজরদারি শেখানো প্রভৃতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো সনমান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আর প্যারেড পিটি অনুষ্ঠিত হতো বিদ্যালয়ের নিকটবর্তী গাছপালা পরিবেষ্টিত মফিজউদ্দিন ক্বারির নির্জন বাগান বাড়িতে এবং দেওয়ানজির ভিটা যেখানে বর্তমানে সনমান্দী হাছান খান উচ্চ বিদ্যালয়ের অবস্থিত সেখানে।প্রায় ২০০ জনের অধিক মুক্তিযোদ্ধাকে এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।সেই সময় সাজালের কান্দি গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা বাচ্চুর মিয়ার একটি মোটর সাইকেল ছিল। এই মোটর সাইকেল ব্যবহার করে উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মুক্তিযোদ্ধারা অল্প সময়ে মধ্যে একস্থান থেকে অন্যস্থান যাতায়াত ও দ্রুত খবর আদান প্রদানে সক্ষম হয়।

পরবর্তীতে আগস্ট ১৯৭১ এর শেষ সপ্তাহে মুক্তিযোদ্ধা খালেক বিন তোরাব, মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম, মুক্তিযোদ্ধা সুরুজ মিয়াসহ ২৭ জনের একটি দল ভারত থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষন নিয়ে সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।এই কেন্দ্র থেকে মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষণ নিয়ে বর্বর হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে চিলারবাগ, আনন্দবাজারের দক্ষিনে মেঘনা নদী তীরবর্তী রানদির খাল যুদ্ধ , লাঙ্গলবন্ধ সহ সোনারগাঁগায়ের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিরোধ গড়ে তোলে ও অসংখ্য সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ন হয়। চিলারবাগে পর পর তিনটি যুদ্ধ সংগঠিত হয়।পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উৎযাপনের প্রাক্কালে ১৩ আগস্ট চিলারবাগ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা এন্টি ট্যাংক মাইনের স্থাপন করে পাক সেনা বহনকারী জীপ উড়িয়ে দেয়।পাক বাহিনী সোনারগাঁয়ের পরপর কয়েকটি যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট পরাস্ত, পর্যুদস্ত ,আহত-নিহত এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির স্বীকার হয়।

ধারণা কর হয় পাকিস্তান সরকারের পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রী এ এস এম সোলায়মানের মাধ্যমে পাক বাহিনী অবগত হয় সনমান্দী গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি ও মুক্তিযোদ্ধা উপ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরের ভোরের সূর্যোদয়ের পূর্বেই সনমান্দী গ্রামকে দক্ষিণ- পূর্ব এবং উত্তর এই তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে। তখন ছিল বর্ষা কাল। বড় বড় ৪০/৪৫ টি নৌকা থেকে এক যোগে সনমান্দী গ্রামের উপর শুরু হয় বৃষ্টির মতো নির্বিচারে গুলিবর্ষণ ও মর্টারের শেল নিক্ষেপ।

অতর্কিত এই আক্রমণ স্বত্তেও মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে।কিন্ত এক সময় অপ্রতুল অস্ত্র ও পর্যাপ্ত গোলা বারুদের অভাবে পাক বাহিনীর অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের কাছে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে। এরই মধ্যে পাক বাহিনী সনমান্দী গ্রামে প্রবেশ করে।এর মধ্যে ঝড়ে যায় নারী শিশু সহ ১০ টি তাজা প্রাণ।গুলিতে শহীদ হন এই দশ জন। আহত হন প্রায় দুই শয়ের অধিক ব্যক্তি ।আত্মরক্ষার্থে শত শত গ্রামবাসী যে যার মতো দ্রুত পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন।মাথার উপর কচুরিপানা দিয়ে লুকিয়ে পানিতে ভাসতে ভাসতে অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে থাকেন।জীবন বাঁচানোর জন্য কেউ কেউ সনমান্দী কবরস্থান কেউবা আশে পাশের গ্রামে আশ্রয় গ্রহণ করেন।পাক বাহিনী সনমান্দী গ্রামে ইয়াহিয়া ও টিক্কা খানের পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করে।গান পাউডার দিয়ে পুরো গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়। ৩৯ টি বাড়িঘর পাক বাহিনীর আগুনে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়।এখনো আহত কয়েকজন শরীরে যুদ্ধের ক্ষত ও বুলেট নিয়ে বেঁচে আছে।

ভয়াল ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে বর্বর পাক বাহিনীর নির্মম গণহত্যার শিকার ও দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী সনমান্দী গ্রামের অধিবাসীরা হলেন –

১. শহিদ ফজলুল করিম
২.শহিদ নুরুল ইসলাম
৩.শহিদ ছমিরউদ্দিন প্রধান
৪. শহিদ তাহেরুন নেছা
৫.শহিদ সাবিলা আক্তার
৬. শহিদ আনোয়ারুল হক
৭. শহিদ ফারুক মিয়া
৮. শহিদ মমতাজ আক্তার
৯. শহিদ আমির আলী
১০.শহিদ মনোয়ারা বেগম

নারী, বৃদ্ধ এমন কি মায়ের কোলে থাকা শিশু পর্যন্ত সেদিনের পাক সেনাদের নির্মম বর্বরতা ও গণহত্যা থেকে রেহাই পায়নি।তাই ভয়াল ২৯ সেপ্টেম্বর এলে সনমান্দী গ্রামের আকাশ বাতাস নিষ্ঠুর নির্মমতা ও নির্বিচারে গণহত্যার বেদনায় ভারী হয়ে ওঠে। স্বজন হারানো প্রিয়জনদের চোখে অশ্রু জমে।এই দিনটিতে স্থানীয় ভাবে গ্রামের মুক্তিযোদ্ধারা শহিদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল এবং আলোচনা সভার আয়োজন পালন করে থাকে।ভয়াল ২৯ সেপ্টেম্বরের প্রক্কালে সোনারগাঁও বাসীদের পক্ষ থেকে সনমান্দী গ্রামের সেইসব শহিদ ও সোনারগাঁয়ের সকল মুক্তিযোদ্ধাকে জানাই সশ্রদ্ধ সালাম।

সীমিত পরিসরে সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ৭১ স্মৃতি সংরক্ষণ সংসদের উদ্যোগে ও আমন্ত্রণে ২০১০ সালে ৩০ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মোঃ গোলাম রাব্বানী সনমান্দী গ্রামের এই ১০ জন শহিদের নাম সম্বলিত ‘একটি শহিদ স্মৃতি ফলক’ উন্মোচন করেন। এই শহিদ স্মৃতি ফলকটি পরে সনমান্দী হাছান খান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে স্থাপন করা হয়।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মাত্র হাতে গোনা দু একটি স্থানে এই ধরনের মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছিল। তাই বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ২০১২ সালে সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও সনমান্দী গ্রামে সংঘটিত গণহত্যা নিয়ে একটি তথ্য চিত্র নির্মাণ করে এবং একাধিক বার তা প্রচার করে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় এই যে, দেশবাসীসহ সোনারগাঁয়ের জনমানুষ, নতুন প্রজন্ম, এমন কি জাতীয় ও স্থানীয় পত্র পত্রিকা ও সাংবাদিকদের নিকট এই গণহত্যার ইতিহাস এখনো অবহেলিত, অজানা এবং অপ্রকাশিত রয়ে গেছে।

সনমান্দী গ্রামে গণহত্যায় নিহত ও মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার পরিজন, আত্মীয়-স্বজন এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে আলাপ করে জানা যায় যে , স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সাক্ষী ও যুদ্ধের গভীর ক্ষত বুকে বহনকারী সনমান্দী গ্রামে সরকারি ভাবে এখনো কোন “শহিদ স্মৃতি স্তম্ভ” বা স্মৃতি ফলক স্থাপিত হয় নাই।তাদের দাবি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কে সংরক্ষণ, নতুন প্রজন্ম কে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ , মেধা ও মননে দেশপ্রেম শানিত করতে হলে অবশ্যই সনমান্দী গ্রামে একটি শহিদ স্মৃতি স্তম্ভ এবং গ্রামের প্রবেশ পথে স্বাগতম সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র লেখা খচিত বিজয় তোরণ নির্মাণ খুবই জরুরি।তা না হলে হয়তো অবহেলা ও অনাদরে একদিন বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে পারে সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ভয়াল ২৯ সেপ্টেম্বরের গণহত্যার ইতিহাস।

পরিশেষে অত্যন্ত আশার কথা হলো এই যে, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু কণ্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকার এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্থান সমূহ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ও যথাযথ উদ্যোগ ইতোমধ্যে গ্রহণ করেছে।বিটিভি’তে প্রচার সহ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখালেখি ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের আবেদন এবং সোনারগাঁও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সার্বিক সহযোগিতায় সোনারগাঁও উপজেলা প্রশাসন সনমান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠের পূর্ব অংশে সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দৃষ্টি নন্দন ‘বিজয় স্তম্ভ ও শহীদস্মৃতি কমপ্লেক্স’ নির্মাণের প্রয়োজনীয় জরিপ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে। আশা করি সদাশয় সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দ নিশ্চিত করে সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বিজয় স্মৃতিস্তম্ভ বা শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে শহীদদের আত্মত্যাগের ইতিহাস চিরস্মরণীয় করে রাখবে।

নিউজবিডি৭১/আ/সেপ্টেম্বর ০৪ ,২০১৮

Share.

Comments are closed.