১৩ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং ‘তুরস্কের বিরুদ্ধে আমেরিকা যুদ্ধ ঘোষণা করেছে’
Mountain View

‘তুরস্কের বিরুদ্ধে আমেরিকা যুদ্ধ ঘোষণা করেছে’

0
image_pdfimage_print

ইব্রাহিম কারাগুল
আমেরিকা সরাসরি আমাদের হুমকি দিচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম, তার সতীর্থরা, বাণিজ্য সঙ্গীরা, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা হুমকি তৈরি করছে। রাশিয়া, চীন ও ইরানের পর এখন তুরস্কের বিরুদ্ধে আমেরিকা যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।

যারা ২০১৬ সালের ১৫ জুলাই তুরস্কের জনগণকে ট্যাঙ্ক ও গুলির নিচে ছুড়ে দিয়েছিল এবং তুরস্ককে গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল তারা আজ আবার তৎপর হয়ে উঠেছে। এখন তারা সবাই মিলে তুরস্ককে আঘাত করছে।

এটা একটি অর্থনৈতিক যুদ্ধ। এটা এমন একটা প্রচেষ্টা যা তুরস্কের অর্থনীতিকে মুখ থুবড়ে ফেলে দিবে। এটা ধর্মগুরু এন্ড্রু ব্রানসন অথবা দেশের মধ্যে আমেরিকার টিকটিকি ফেতুল্লাহ সন্ত্রাসী সংগঠন ফেতো এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

আমেরিকার হুমকি একই সাথে রাজনৈতিক আক্রমণও বটে! তুরস্ককে থামিয়ে দিতে আমেরিকার প্রশাসন ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্ররা ব্যবস্থা নিচ্ছে। সেই ১৫ জুলাই যে কাজগুলো তারা করতে পারেনি সেগুলো এখন প্রয়োগ করা শুরু করেছে।এই প্রচেষ্টা তুরস্ককে সরাসরি আঘাত করার শামিল।

আমেরিকাকে যাতে মধ্যপ্রাচ্য নতজানু, নিরব ও একাকী না হয়ে যেতে হয় এজন্য তারা তুরস্কের উন্নতি ও শক্তিশালী হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তাদের এসব পদক্ষেপ তুরস্ককে শাস্তি দেয়ার চেষ্টা। তুরস্ক এখন এশিয়ার শক্তি হওয়ার পথে। আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের শাসন তুরস্ক প্রত্যাখান করেছে। তুরস্ক এক শতাব্দি পর নবযুগের সূচনা করেছে। তুরস্ক বিশ্বে শক্তি প্রদর্শনের অন্যতম নিয়ামক হতে চলেছে।

তুরস্কের ওপর প্রতিশোধ নিতে আমেরিকা এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে। সেলজুক, অটোমান এবং গণতান্ত্রিক যুগের পর্যায়ক্রমিকতা তুরস্ককে ইতিহাসের নতুন সময়ে প্রবেশ করিয়েছে এবং পরিবর্তন এনে দিয়েছে।

এটাই হচ্ছে তুর্কি জুজু যা আমেরিকাকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। বিশ্বে ক্ষমতার পরিবর্তন আমেরিকাকে হিংস্র করে তুলেছে। আমেরিকার এই অবস্থা শুধু তুরস্কের জন্য নয়, বিশ্বের জন্য হুমকি স্বরুপ। পৃথিবীকে উন্মাদনার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তারা।

রাশিয়া, ইরান, চীন ও তুরস্কের ওপর তারা অর্থনৈতিক যুদ্ধ চাপিয়েছে। এরপর তারা শীঘ্রই জার্মানি, অন্যান্য ইউরোপিয়ান দেশগুলো, দক্ষিণ আমেরিকা ও এশিয়ার দেশগুলোর ওপরও অর্থনৈতিক যুদ্ধ চাপাবে।

আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব এতদিন যে অর্থনৈতিক শাসন করেছে আজ তা খর্ব হতে চলেছে। তারা এখন বিশ্বের সম্পদ লুট করতে উন্মাদ হয়ে গেছে। গত ১৫ বছরে তুরস্ক যে সম্পদ অর্জন করেছে তা লুটতরাজের পরিকল্পনা করেছে আমেরিকা।

বিশ্ব এখন হুমকির মধ্যে আছে। এখন অর্থনৈতিক অবরোধ যুদ্ধ চলছে। এরপর রাজনৈতিক ও সামরিক ঝড় আসবে। দেশগুলোর উচিত লুটতরাজের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং একযোগে কাজ করা।

আমেরিকা এখন ভারসাম্যহীন রাষ্ট্র। তারা এখন যা কিছু করতে পারে। দেশটি সারাবিশ্বের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়েছে। বন্ধু দেশ হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। লাতিন আমেরিকা থেকে দূরপ্রাচ্যের এশিয়া সর্বত্র অস্বস্তি তৈরি করেছে আমেরিকা। সেজন্য আমেরিকা এখন যা কিছু করতে উন্মাদ হয়ে গেছে।

ডলারের বিপরীতে নিজস্ব মুদ্রার ব্যবহার আমেরিকা নেতৃত্বাধীন বিশ্বের জন্য চ্যালেঞ্জ। এই ঘটনা আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বের খবরদারি খর্ব করবে। এজন্য আমেরিকা সম্প্রতি তুরস্কের ওপর রেগে গিয়েছে। আমেরিকাকে প্রত্যাখান করার এই প্রবণতা বিশ্বের জন্য নতুন মুল্যবোধ তৈরি করবে।

রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদ তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, আমেরিকা অর্থনৈতিক যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাই যদি হয় তাহলে আমরা রাজনীতি ও অন্যান্যভাবে অর্থনৈতিক এই লড়াই মোকাবেলা করবো।

এই কথার অর্থ কী? সামরিক পদক্ষেপ? এরকম কিছু হলে বিপদজনক কিছু হবে বিশ্বের জন্য।

তাহলে আমরা এখন কী করতে পারি? আমেরিকা চাপ দিচ্ছে বলে কি আমরা ভিক্ষা করবো? ডলার প্রত্যাখান করায় তুর্কি পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। তাই বলে ইতিহাস গড়ার পথ থেকে আমরা সরে পড়বো?

আমরা যদি তাই করি তবে ১৫ জুলাই সামরিক ক্যু প্রতিহত করেছিলাম কেন? সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কেন লড়ে যাচ্ছি? সিরিয়া ইস্যু থেকে আমাদেরকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা কেন আমরা প্রতিহত করছি?

এই তৎপরতা থেকে ফিরে আসা আত্নহত্যার শামিল। এটা ধ্বংস ডেকে আনবে। ইতিহাস থেকে আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবো। ভবিষ্যত থেকে আমরা হারিয়ে যাবো। আমরা কখনই তা করবো না।

অর্থনৈতিক সংগ্রাম আর দেশের জন্য সংগ্রামের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে আঘাত দেয়া এই নেকড়ে, কুকুর ও লুটেরাদের কাছে আমরা আত্নসমপর্ণ করবো না।

প্রতিরোধ ছাড়া আমাদের অন্য কোন সুযোগ নেই। আমাদের সত্যিকার অর্থে অন্য কোন উপায় নেই। মহৎ এই সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

যারা বলছে ‘আমরা তো করি’তারা মিথ্যা বলছে। যারা বলে ‘আমরা করি’ তারা আসলে পরীক্ষার ব্যাপকতা বুঝে না অথবা হামলার একজন সহযোগী হয়ে কাজ করে।

তুরস্ক ক্রুসেড প্রতিহত করেছিল। এই জাতি সমগ্র আনাতোলিয়া শাসন করেছে। ইউরোপের রহস্যভেদ করেছে। এই জাতির অবিশ্বাস্য রাজনৈতিক সম্পদ রয়েছে। এই জাতি একাই ১ হাজার বছর ধরে ইতিহাস রচনা করেছে। এটাকে হালকা করে নেয়া কারো জন্যে উচিত হবে না। আমরা কঠিন সময় অতিক্রম করে এসেছি। এমন সময়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছি যখন তারা বলেছিল, আমরা শেষ!

আমরা আবার সেটা করবো। আমরা গত ১৫ বছর ধরে এই পথেই হাঁটছি। আমাদের চলা অব্যাহত রাখবো। কোন রকম দ্বিধা ছাড়াই আমরা সংহতি বজায় রাখবো। চরম মূল্য দেয়া ছাড়া আমাদের বিজয় অর্জন হবে না। মুল্য দেয়া ছাড়া আমরা গড়ে উঠতে পারবো না।মহৎ জাতি হিসেবে ইতিহাস লেখা হবে না।

চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। এখন সংগ্রাম করার সময়। এটা অর্থহীন দাবি নয়। আমরা জিতবোই। আমরা ভয় পেয়ে হতোদ্যম হবো না। আমাদের জাতির ওপর নগ্ন হামলার বিরুদ্ধে আমরা নিরব থাকবো না। আমেরিকা পরাজিত হবে। বিশ্ব আমেরিকার ওপর প্রতিশোধ নিবেই। এটা অর্থনৈতিক যুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জনের সময়।

লেখক: ইব্রাহিম কারাগুল
তিনি বর্তমানে তুরস্কের প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম ইয়ানি শাফাকের এডিটর-ইন-চিফ হিসেবে কর্মরত আছেন।

নিউজবিডি৭১/এম কে/আগস্ট ১৪ , ২০১৮

Comments are closed.