১৬ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং সড়ক দুর্ঘটনার লাগাম টেনে ধরতেই হবে
Mountain View

সড়ক দুর্ঘটনার লাগাম টেনে ধরতেই হবে

0
image_pdfimage_print

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)
কয়েক দিন আগে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ রমিজ উদ্দিন স্কুলের একজন ছাত্রী ও একজন ছাত্রের বিমানবন্দর সড়কে বাসের চাপায় যেভাবে মর্মান্তিক ও করুণ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে গেল, তাতে মানুষমাত্র সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েছে। সাথি হারানোর সহজাত মর্মযাতনা ও পীড়নে ওই স্কুলের অন্য কিশোর শিক্ষার্থীরা সেদিন রাস্তায় নেমে এসে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ শুরু করে। ক্ষুব্ধ ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় এসে গাড়ি ভাঙচুর এবং দীর্ঘ সময় যান চলাচল আটকে দেয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তরুণ সম্প্রদায় সচেতন হবে, সোচ্চার হবে এবং আন্দোলন-সংগ্রাম করবে সেটাই প্রত্যাশিত। তারা যদি সত্যিকার অর্থে অপরাজনীতি ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতির খপ্পরের বাইরে থেকে দেশব্যাপী অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তাহলে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে অন্যায় দূর হতে বাধ্য। আমরা চাই আমাদের তরুণ প্রজন্ম সব বিষয়ে সচেতন হোক এবং সত্যের অনুসন্ধান করুক। যারা মিথ্যাচার করছে তাদের প্রত্যাখ্যান করুক এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াক। তবে অন্যায় ও অপরাধের প্রতিবাদ এবং তার বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করা এক কথা, আর আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়া এবং নিরপরাধীদের ওপরেও নির্বিচারে আক্রমণ চালানো ও ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করা ভিন্ন কথা।

শান্তিপূর্ণ পন্থায় আন্দোলন করে শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বে তা কিভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায় তার উজ্জ্বল উদাহরণ তো তরুণ প্রজন্মের সামনে রয়েছে, যেটি ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সৃষ্টি করেছিল গণজাগরণ মঞ্চ। আন্দোলনের প্রধান টার্গেট যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতের কোনো সহায়-সম্পদের ওপর একটি ঢিলও সেদিন ছোড়া হয়নি। অথচ কত কার্যকর হয়ে উঠেছিল সেই আন্দোলন। জনদুর্ভোগ নয়, ভাঙচুর নয়, আইন নিজেদের হাতে তুলে নয়। তার পরও সেটি সরকারসহ রাষ্ট্রের সর্বত্র কিভাবে তোলপাড় সৃষ্ট করেছিল তা আমরা সবাই সেদিন দেখেছি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেরা আরেকটি অন্যায় কাজ করে, নির্বিচারে ভাঙচুর ও নিরপরাধ মানুষের ওপর আক্রমণ চালিয়ে উচ্ছৃঙ্খলতার সৃষ্টি করে আন্দোলনের মহৎ উদ্দেশ্য কোনো দিন কোথাও অর্জিত হয়নি। বরং দেখা গেছে তখন ওই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অপরাজনীতির ষড়যন্ত্রকারীরা সেটিকে নিজেদের ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, যা আমরা সম্প্রতি চাকরিতে কোটাবিরোধী আন্দোলনের সময় দেখেছি। মহৎ উদ্দেশ্য সাধন করতে চাইলে তরুণ প্রজন্মকে এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে।

এর আগেও বড় বড় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং প্রতিবাদ ও আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু আকাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। সেদিন রমিজ উদ্দিন স্কুলের ছাত্র নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারা দেশে যা ঘটেছে তাতে ভালো কী মন্দ হয়েছে তার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে একজন ক্যাবিনেট র‌্যাংকের মন্ত্রীর উক্তি ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, যা তিনি সেদিন ওই দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মিডিয়ার কাছে ব্যক্ত করেছেন। যদিও ওই মন্ত্রী মহোদয় পরবর্তী সময়ে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু কথায় আছে, বন্দুক থেকে গুলি একবার বের হয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা যায় না। একটা কথা কত ভয়ংকর হতে পারে। আল্লাহর মাল আল্লায় নিয়ে গেছে—কথাটি এখনো মানুষের মুখে মুখে থাকে। উইনস্টন চার্চিল একবার বলেছিলেন, নো কমেন্টস ইজ দ্য বেস্ট কমেন্টস। আমাদের মন্ত্রী-নেতারা এগুলো কবে জানবেন। মিডিয়ার মাইক্রোফোন পেলেই মনে হয় তাঁরা দিশাহারা হয়ে যান। অপরিপক্ব কথা বলে ফেলেন এবং শেষ পর্যন্ত তার দায় গিয়ে পড়ে প্রধানমন্ত্রী ও পুরো সরকারের ওপর। আলোচিত মন্ত্রী এর আগেও সড়ক দুর্ঘটনার বিষয় নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন, যা একজন মন্ত্রীর জন্য মোটেও মানানসই নয়। ট্রেড ইউনিয়ন নেতার ভাষা আর একজন মন্ত্রীর ভাষা একই রকম হতে পারে না।

গত সপ্তাহে আমেরিকা থেকে ফেরার পথে নিউ ইয়র্ক বিমানবন্দরে অপেক্ষার সময় একজন বাংলাদেশি ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় ও কথা হলো। তিনি প্রায় ২৫ বছর ধরে নিউ ইয়র্কে বসবাস করছেন এবং অত্যন্ত ভালোভাবে সেখানে প্রতিষ্ঠিত। তিনিও ঢাকায় আসছিলেন। কথায় কথায় ভদ্রলোক বললেন, বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশে অভাবনীয় উন্নয়ন হয়েছে, যা এখন বিশ্বের জন্য রোল মডেল। জঙ্গি দমনে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অনুকরণীয় উদাহরণ সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ। বিশ্ব অঙ্গনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান ও মর্যাদা এককথায় ঈর্ষণীয়। নিউ ইয়র্কের বিশাল বিমানবন্দরে বসে ওই ভদ্রলোক আরো বললেন, সব কিছু মিলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আরো দু-তিন টার্ম ক্ষমতায় আসা কোনো ব্যাপারই হওয়ার কথা নয়। কিন্তু দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছাত্রলীগ, যুবলীগ নামধারী সামান্য কিছুসংখ্যক মানুষের অপকর্ম ও আচরণ এবং মাঝেমধ্যে কয়েকজন মন্ত্রীর লাগামহীন ও অপ্রত্যাশিত কথাবার্তা সব কিছুকে ম্লান করে দিচ্ছে। জাতীয় নির্বাচন একেবারে দোরগোড়ায়। সরকারের বিপক্ষে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী গোষ্ঠী, সেই জামায়াত-বিএনপি নিজেদের অপকর্মের কারণে রাজনীতির মাঠে আজ একেবারে কোণঠাসা হয়ে প্রান্তিক অবস্থানে চলে গেছে। তারা এখন খড়কুটো ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। যেকোনো সুযোগে ষড়যন্ত্র ও অপরাজনীতিই এখন তাদের একমাত্র ভরসা। ছাত্রদের চাকরির জন্য কোটাবিরোধী আন্দোলনের ওপর ভর করে বিএনপি যে ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছিল, তা জানাজানি হয়ে যায় লন্ডন থেকে তারেক রহমান কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে যে ফোনে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর।

গত সপ্তাহের সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোমলমতি ছাত্রদের আবেগের ওপর নির্ভর করে বিএনপি আবার ষড়যন্ত্রের পথে হাঁটবে সেটাই স্বাভাবিক। আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করবে তা মনে রেখেই সবাইকে আচরণ করতে হবে। কথায় কথা চলে আসে। মূল প্রসঙ্গে ফিরে যাই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন সংস্থা সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) গভীর তাৎপর্যপূর্ণ একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেটি পত্রিকায় ছাপা হয় ২০১৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে। এই প্রতিবেদন অনুসারে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয় এবং তার জের ধরে পরে মৃত্যুবরণ, এমন মানুষের সংখ্যা গড়ে প্রতিদিন ৬৪ জন। ২০১৬ সালে এর মোট সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ১৬৬ জন। এর বাইরে সড়ক দুর্ঘটনায় অন দ্য স্পট মৃত্যুর পরিসংখ্যান নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদন বের করেছে বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই), যেটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালের মার্চ মাসের ৩ তারিখে। বুয়েটের প্রতিবেদন অনুসারে ১৯৯৪ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত—২৩ বছরে মোট ৮৪ হাজার ৪৩৫টি দুর্ঘটনায় অন দ্য স্পট মৃত্যু হয়েছে ৬৪ হাজার ১১২ জন মানুষের। বছরে গড়ে দুই হাজার ৭৮৭ জন, অর্থাৎ দৈনিক গড়ে আটজন। আহত হয়ে পরে মৃত্যুবরণ এবং অন দ্য স্পট মৃত্যুবরণ—দুটি যোগ করলে বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে মারা যাচ্ছে ২৫ হাজার ৯০৩ জন, তাতে দৈনিক মারা যাচ্ছে গড়ে ৭১ জন। বিভিন্ন রকমের দুর্ঘটনার কারণে বছরে প্রায় দুই কোটি লোক আহত হয়, যার মধ্যে দুই লাখ ৪১ হাজার মানুষ ছোট-বড় পঙ্গুত্ববরণ করে। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত আহতের সংখ্যা সর্বোচ্চ। নিহত হওয়া ও পঙ্গুত্ববরণের সংখ্যাই বলে দিচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা জননিরাপত্তার জন্য কত বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে, যা কমছে না, বরং দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কি কোনো প্রতিকার নেই?

একবিংশ শতাব্দীতে প্রতিকারহীন কোনো সংকট নেই—এ কথা সবাইকে স্বীকার করতে হবে। বুয়েটের প্রতিবেদন বলছে, গত ২৩ বছরে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য কারোরই তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো শাস্তি হয়নি। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) তথ্য, যা পত্রিকায় ছাপা হয়েছে সে মতে দেশে মোট ২৯ লাখ খতিয়ানভুক্ত গাড়ি আছে, যার বিপরীতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকের সংখ্যা ১৯ লাখ। অর্থাৎ বাকি ১০ লাখ গাড়ি চালাচ্ছে ভূতে। এ কারণেই গত বছর একটি দৈনিকের শিরোনাম ছিল, সাড়ে ১৩ লাখ অবৈধ চালকের হাতে যাত্রীর নিরাপত্তা। প্রকাশিত তথ্য মতে, ১০ থেকে ১৩ লাখ অবৈধ চালক গাড়ি চালাচ্ছে। বেসরকারি হিসাব মতে, অবৈধ চালকের সংখ্যা হবে প্রায় ৪৪ লাখ। কারণ ১০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ নসিমন-করিমন, লেগুনা, টেম্পো ইত্যাদি নামে সারা দেশে কত লাখ গাড়ি আছে তার কোনো সঠিক হিসাব কারো কাছে নেই।

দুর্ঘটনা বা অ্যাকসিডেন্ট শব্দ সম্পর্কে একটা মিথ সৃষ্টি করা হয়েছে। তাতে মনে হতে পারে, এর জন্য কেউ দায়ী নয়, সব হচ্ছে দৈব ইশারায়। একবিংশ শতাব্দীতে এ কথা মানতে মানুষ রাজি নয়। যা কিছু ঘটে তার পেছনে অবশ্যই কারণ রয়েছে, আর সে কারণ সৃষ্টি করছে মানুষ। সেই মানুষকে চিহ্নিত করে শাস্তি প্রদান করা সভ্যতার দাবি এবং আইনের কথা। তা না হলে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব প্রমাণ হয় না। মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা থাকে না। একবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জোরে যেকোনো ঘটনার কারণ নির্ণয় এবং তার জন্য দায়ীদের শনাক্ত করা অসম্ভব কাজ নয়। শুধু দরকার রাষ্ট্রযন্ত্রের সদিচ্ছা। সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর শুধু দুর্ঘটনা নয়, রীতিমতো হত্যাকাণ্ড। বুয়েটের গবেষণা বলছে, মোট দুর্ঘটনার মধ্যে ৮০ শতাংশের ঊর্ধ্বে ঘটে চালকের বেপরোয়া ও অধিক গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য। সুতরাং অনেক হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার লাগাম এখন টেনে ধরতেই হবে। জননিরাপত্তার স্বার্থে তা এখন একান্ত প্রয়োজন।

লেখক : কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

Sikder52@gmail.com

নিউজবিডি৭১/এম কে/৬ আগস্ট, ২০১৮

Share.

Comments are closed.