১৮ই জুলাই, ২০১৮ ইং ঢাকা শিশু হাসপাতালে জরুরি বিভাগের টিকিটের মূল্য ২৩ গুণ
Mountain View

ঢাকা শিশু হাসপাতালে জরুরি বিভাগের টিকিটের মূল্য ২৩ গুণ

0
image_pdfimage_print

নিউজবিডি৭১ডটকম
ঢাকা : ঢাকা শিশু হাসপাতালে সাধারণ বিভাগের টিকেট ১০ টাকা হলেও জরুরি বিভাগের টিকেটের মূল্য ২৩০ টাকা। ফলে জরুরি অবস্থায় প্রায় ২৩ গুণ বেশি টাকা গুণতে হচ্ছে রোগীর স্বজনদের। শিশুর জন্য কম খরচে সরকারি সেবা নিশ্চিত করার কথা বলে গুরুতর অবস্থার সুযোগ নিয়ে বেশি অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন এই হাসপাতালে সেবা নিতে আসা শিশুদের অভিভাবকরা। এই হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধ না পাওয়া, পদে পদে ঘুষ নেওয়ার মতো অনিয়মেরও অভিযোগ করেন তারা।

সম্প্রতি ঢাকা শিশু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা বেশ কয়েকটি শিশুর স্বজনদের সঙ্গে কথা হয় । টঙ্গী থেকে আসা সুরাইয়া বেগম (২২) তার ৯ মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে জরুরি বিভাগের সামনে বসে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমার সন্তানের প্রথমে জন্ডিস হয়েছিল। এখন পেটে পানি জমে গেছে। তাই তাকে এখানে নিয়ে এসেছি। চিকিৎসকরা শিশুকে দেখার পর ভর্তি দিয়েছেন। কিন্তু টানা ৪/৫ ঘণ্টা ঘোরাঘুরি করেও আমার ভাই (সুমন) বাচ্চাটাকে ভর্তি করতে পারেনি। এখানে ভর্তি করাতে গেলে দালালে বাড়তি টাকা চায়। এখন হাতে টাকা নাই, চেষ্টা করছি কম টাকায় কীভাবে ভর্তি করা যায়। এজন্য দেরি হচ্ছে।’

সুরাইয়া বেগম বলেন, ‘এর আগে আমার বাচ্চাকে নিয়ে ১৫ দিন এখানে ভর্তি ছিলাম। এখানকার চিকিৎসা ভালো। গরিব রোগীদের চিকিৎসা ভালো দেয়। খাবার, ওষুধ ফ্রি দেয়।’

মোহাম্মদপুর থেকে বোনের তিন মাসের সন্তানের হঠাৎ জ্বর হওয়ায় তাকে নিয়ে এসেছেন মাফরুহা মাহাররুখ (২৩)। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাসার সব ছোট্ট শিশুদের এখানে চিকিৎসা করাই। এখানকার চিকিৎসা ভালো। তবে শিশু হাসপাতাল হিসেবে এটি আরও গুছানো ও পরিচ্ছন্ন হতে পারতো। এখানকার জরুরি বিভাগের চিকিৎসাও ভালো। এলেই চিকিৎসক পাওয়া যায়। তবে জরুরি বিভাগে শিশু দেখাতে ২৩০ টাকা করে নেয়। আমার কাছে টাকাটা বেশি মনে হয়। কারণ স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, সব হাসপাতালে ১০ টাকায় টিকিট পাওয়া যাবে।’

শাহজাহানপুর থেকে নিজের তিন বছর বয়সী সন্তান নিয়ে ডাক্তার দেখাতে আসেন নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এখানকার চিকিৎসা ভালো হলেও সব ওষুধ এখান থেকে পাওয়া যায় না। আমার ছেলে তিনদিন আইসিইউতে ছিল। তখন কিছুক্ষণ পর পর নার্স চিরকুট লিখে দিত যে, রোগীর এই ওষুধ, ওই ওষুধ লাগবে, নিয়ে আসেন। সেই ওষুধ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে গিয়ে কিনে আনতে হতো। আইসিইউতে বিশেষ বিশেষ রোগীদের জন্য সবসময় ওষুধ বরাদ্দ রাখা দরকার। তাহলে রোগীরা ভালো সেবা পাবে।’

নিজের দশ বছর বয়সী ভাগ্নেকে চিকিৎসা করাতে নিয়ে আসেন শেরপুর জেলার বাসিন্দা জান্নাতুল ফেরদৌস (৩২)। তিনি বলেন, ‘প্রথমে শেরপুরের হাসপাতালে দেখাই। তারা এখানে রেফার করেছে। আমার ভাগ্নের কিডনির সমস্যা, তাকে এখানে এনে অস্ত্রোপচার করাই। এখন কেমন আছে দেখানোর জন্য ফলোআপে এনেছি। আমার ভাগ্নের অপারেশন ফ্রি করে দিয়েছে। আমরা খুবই গরিব। ওই টাকা দেওয়ার আমাদের সামর্থ্য ছিল না।’ তিনি জানান, শিশু হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ কেয়ারের অবস্থা খারাপ। কোনও এসি নাই। মাত্র দুইটা ফ্যান। সেটাও বিদ্যুৎ চলে গেলে বন্ধ থাকে। শিশুরা এখানে খুবই কষ্ট পায়।

জরুরি বিভাগের সামনে রোগীদের অপেক্ষা করার জায়গাটি বেশ ছোট। সেখানে শিশুবান্ধব তেমন কিছু নেই উল্লেখ করে সুত্রাপুর থেকে আসা সেগুফতা সেঁজুতি বলেন, ‘এটা শিশু হাসপাতাল, কিন্তু শিশুবান্ধব কিছুই এখানে পাবেন না। শিশুদের জন্য বিশেষ কোনও ব্যবস্থা এরা রাখেনি। শিশু হাসপাতাল হিসেবে এটি বেশ নোংরা থাকে। একটা সাধারণ হাসপাতাল যেমন এটাও তেমনি। আমাদের দেশে তো ১৮ বছর পর্যন্ত শিশু। এখানে ১২-১৩ বছরের কেউ অভিভাবক ছাড়া এসে চিকিৎসককে দেখাতে পারবে না। এটা তো ঠিক না।’
ঢাকা শিশু হাসপাতাল

ঢাকা শিশু হাসপাতালের একজন মেডিক্যাল অফিসার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা এখানকার জরুরি বিভাগের ইকুইপমেন্ট নিয়ে সন্তুষ্ট। তবে কিছু ইমপ্রুভমেন্ট হলে আমরা আরও ভালো কাজ করতে পারবো। আমাদের এখানে মোটামুটি লজিস্টিক সাপোর্ট আছে। আমাদের পক্ষ থেকে হ্যান্ডফুল সাপোর্ট আমরা দিতে পারি। একটা সাধারণ অভিযোগ আপনারা প্রায়ই শোনেন, রোগী মারা গেছে বলছে, এরপর তাকে ছেড়ে দেওয়ার পর অভিযোগ আসে যে রোগী আবার নড়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে একটা ইসিজি মনিটর থাকলে আমরা কনফার্ম করে বলতে পারি। অনেক সময় আসলেই হার্টবিট থাকে। এইক্ষেত্রে ইন্টারন্যাশনাল সিস্টেম হচ্ছে একটি ইসিজি মেশিন দেখে ৫-১০ মিনিটে ঘোষণা দেওয়া। এটা থাকলে আমাদের আমাদের জন্য ভালো হয়।’

তিনি বলেন, ‘অনেক সময় শিশুর শরীর নীল হয়ে গেছে বলে। এসময় পালস অক্সিমেট্রি জানতে পারলে খুব ভালো হয়। ইদানিং হাতে বহন করার মতো ছোট ছোট পালস অক্সিমেটর পাওয়া যায়। এছাড়া শিশুদের মোবাইল সেটআপ দিয়ে ইমার্জেন্সি থেকে নিয়ে যাই। কিন্তু যেসব শিশু বড় তাদের জন্য জরুরি বিভাগ থেকে ট্রলি দিয়ে নিয়ে যেতে পারে। একটা-দুইটা অবজারভেশন বেড থাকলে ভালো হয়।’

তিনি জানান, ‘আমাদের এখানে ইনকিউবেটর যা আছে তা পর্যাপ্ত, তবে আরও হলে অবশ্যই ভালো হয়। আমাদের কার্ডিয়াক ও ডায়ালায়সিস ইউনিট হয়েছে। এখন এগুলোতে সারাদেশ থেকে রেফারেন্স রোগী আসছে। আমরা এখন যে অবস্থায় আছি এভাবেই চালিয়ে যেতে পারলে আগামী ১৫ বছরের মধ্যে আমাদের হাসপাতাল আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি হাসপাতাল হবে। তখন আশেপাশের দেশ থেকেও আমাদের এখানে রোগী আসবে।’

ঢাকা শিশু হাসপাতালের ডেপুটি ডিরেক্টর ডা. আবু তৈয়ব বলেন, ‘জরুরি বিভাগে শিশু ভর্তির টাকা ২৩০ হওয়াটা অনেক বেশি। আমরা অনেক কিছু কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি। আমরা কেবিন ভাড়াসহ অন্যান্য ভাড়া বাড়ানোর ব্যাপারে আপত্তি জানাচ্ছি। আমরা সবকিছুর ব্যবস্থা করতে না পারলে কোনওকিছুর মূল্য বাড়াতে রাজি নই। ফ্রি দিয়ে আমরা কিছু রোগীর সহযোগিতা করতে পারি। রোগীরা ভর্তি হলে কোনও সমস্যা নিয়ে কিছুই বলে না। কোনও অভিযোগও আসে না। তারা শুধু সেবাটা চায়। তারপরও আমরা নিজেরাই ঠিক করে চলার চেষ্টা করি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে এখন ২০টি ইনকিউবেটর আছে। ভেন্টিলেটর মেশিন আছে আটটি। আরও থাকলে ভালো হতো। আমরা ফান্ডের দিক দিয়ে অনেক কৃচ্ছ্রতা সাধন করছি। এক বছরের মধ্যে আশা করছি আমাদের হাসপাতালের সিস্টেম আরও একটু ভালো হবে।’

নিউজবিডি৭১/আ/জুলাই ১২ ,২০১৮

Share.

Comments are closed.