১৮ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং পত্রিকায় উদ্দেশ্য প্রণোদিত মিথ্যা সংবাদ প্রচারিত হলে করনীয়
Mountain View

পত্রিকায় উদ্দেশ্য প্রণোদিত মিথ্যা সংবাদ প্রচারিত হলে করনীয়

0
image_pdfimage_print

সংবাদিকতা একটি মহান পেশা। এ পেশাকে মানুষ অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখে। এ পেশার লোকজনকে অনেকেই জাতির বিবেক বলে থাকেন। প্রকৃত সাংবাদিকের কোন দেশ কাল প্রাত্র নেই। তারা জগৎ সভার এক একজন পরীক্ষক ও নিরীক্ষক। সামাজিক অনাচার ও বৈপরিত্যের বিরুদ্ধে সাংবাদিকতা একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা, মানবতার অতন্দ্র প্রহরী সাংবাদিকরা দেশ ও জাতির শেষ ভরসা। সৎ ও নিষ্ঠাবান সাংবাদিকরা এসব কিছু মোকাবিলা করেই তাদের পেশার সম্মানকে অমলিন করে রাখছেন। দেশ, জাতি নয়, বিশ্ব উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারেও সাংবাদিকদের অগ্রণী ভূমিকা দেশে দেশে স্বীকৃত। সাধারণ জনগণের এ মহান পেশার প্রতি প্রগাঢ় আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে। কারণ এ সমাজের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে তরবারির ন্যায় কলমের শানিত অস্ত্র একমাত্র সাংবাদিকরাই ধরে থাকেন। বিভিন্ন ধরনের ঘটনা প্রবাহের সংবাদ পরিবেশনের পাশাপাশি পত্রিকার মাধ্যমে দেশের বর্তমান অবস্থা ও করণীয় বিষয়ও অহরহ দিক-নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। তবে আমরা ব্যথিত ও মর্মাহত হই তখন, যখন দেখি কোন সাংবাদিক ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিবেচনায়, অহংকার কিংবা প্রলোভনের কারণে সাংবাদিকতার নীতিমালা এবং কর্তব্যবোধ বিসর্জন দিচ্ছে। অর্থলোভী, স্বার্থান্বেষী, টাউট-বাটপারদের যথেষ্ট বিচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে এ মননশীল কর্মচর্চায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাংবাদিক মাত্রই সাধারণ মানুষের কাছে পরিণত হয়েছে এক ভীতিকর প্রাণীতে। দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের দেশের সংবাদপত্র সম্পর্কে, মানুষ বিশ্বাস ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে। যে সব সাংবাদপত্র এ ধরনের মিথ্যা, বানোয়াট কিংবা উদ্দেশ্যমূলক সংবাদ পরিবেশন করে তারা প্রচলিত আইন-কানুন, সংবিধান এক কথায় সমগ্র দেশ ও জাতির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছেন। এই ধরনের সাংবাদিকদের রাজনৈতিক স্বার্থান্ধতা ও অনৈতিক কার্যকলাপের কারণে সাংবাদিকতার মত এ মহান পেশাও আজ প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে। লেখার স্বাধীনতা মানে অন্যের অধিকার, সামাজিক অবস্থান, মান-সম্মানকে উপেক্ষা করা নয়। লেখার স্বাধীনতার সুবাদে এরা ন্যূনতম বিধি-বিধান আর নীতি-জ্ঞানকে তোয়াক্কা না করে সত্যকে গোপন করে মিথ্যাকে ফুলিয়ে রং লাগিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা নয়। আপত্তিকর, অসত্য ও বানোয়াট সংবাদ প্রকাশ করে সুনাম, যশ ও পারিবারিক সুনাম ক্ষুন্ন করা হচ্ছে। বিশেষ একটি মহলের ইন্ধনে পত্রিকায় অসত্য, মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন, মানহানিকর ও কুৎসাপূর্ণ গালগপ্প ছেপে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সুনাম, সুখ্যাতি ও নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টাই সহ সামাজিক ও পারিবারিকভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত বিরূপ ও বিড়ম্বনাকর পরিস্থিতিতে নিক্ষেপ করেছে। এক্ষেত্রে আমাদের বিদ্যমান আইনে প্রতিকারের ব্যবস্থা আছে৷ আপনার নামে পত্রিকায় মিথ্যা উদ্দেশ্য প্রণোদিত সংবাদ প্রচারিত হলে আপনি সাংবাদিক (লেখক), প্রকাশক ও সম্পাদকের বিরুদ্বে দেওয়ানী ও ফৌজদারী আদালতে মামলা করতে পারেন। সংবাদপত্রে ভুল, মিথ্যা তথ্য ও উদ্ধৃতি ইলেটনিক মিডিয়ায় ছাপা হলে সাংবাদিক (লেখক), প্রকাশক ও সম্পাদকের বিরুদ্ধে তথ্য প্রযুক্তি আইনে মানহানি মামলা করতে পারেন। যার অর্থদণ্ড কোটি টাকা হতে পারে। মামলার না করলে এটা সংবাদপত্র হলে আপনি প্রেস কাউন্সিলে যেতে পারেন৷ প্রেস কাউন্সিলের দারস্ত হলে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে না ৷ কাউন্সিলের সদস্য সংখ্যা ১৫ জন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক পদে কর্মরত আছেন কিংবা যিনি সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিযুক্ত হওয়ার যোগ্যতা রাখেন, কেবল তিনিই প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হতে পারেন। রাষ্ট্রপতি তাঁকে মনোনয়ন দেন। সংবাদপত্র, সংবাদ সংস্থা বা সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কেউ নালিশ করলে তার বিচার করা। অবশ্য স্বতঃপ্রণোদিত হয়েও কাউন্সিল সাংবাদিকতার নীতিভঙ্গজনিত অন্যায় তদন্ত করতে পারেন। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা সংস্থাকে কাউন্সিল তিরস্কার, নিন্দা বা হুঁশিয়ার করতে পারেন। প্রেস কাউন্সিল তাঁর দায়িত্ব সম্পাদনকালে কিছু বিষয়ে দেওয়ানি আদালতের ক্ষমতা ও অধিকার ভোগ করেন। সাক্ষীদের সমন দেওয়া, কাউন্সিলে হাজির করা, জবানবন্দি গ্রহণ, দলিল তলব করা ও সেগুলো হাজির করতে বাধ্য করা, অ্যাফিডেভিটের মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণ, অফিস-আদালত থেকে সরকারি নথি তলব করা প্রভৃতি বিষয়ে প্রেস কাউন্সিলের অধিকার দেওয়ানি আদালতের সমান। প্রেস কাউন্সিলের কাজকে ‘বিচার কর্ম’ হিসেবে গণ্য করা হয়। সে কারণে প্রেস কাউন্সিলের সামনে কেউ মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে তিনি দণ্ডনীয় অপরাধে অপরাধী হন। প্রেস কাউন্সিলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আপিল করা বা এ বিষয়ে আদালতে কোনো মামলা করা যায় না। আবার একজন সংবাদিক কোন তথ্য সংগ্রহের পর ভুল হতে পারে, সেটা রিপোর্ট আকারে ছাপা হওয়ার পর সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি প্রতিকার চাইলে সংবাদপত্রকে ক্ষমা চাইতে হবে, সংশোধনী ছাপতে হবে৷ যে জায়গায় খবর ছাপা হয়েছে, ঠিক সেখানেই প্রতিবাদটা ছাপতে হবে৷

১৪০০ শত বছর আগে সাংবাদিকতা বিষয়ে মহান আল্লাহ পাক যে গাইড লাইন দিয়ে গেছেন তা এক কথায় অনন্য। ইসলামে সাংবাদিকতা এক ধরনের আমানত। এই আমানত হচ্ছে, যে কোনো তথ্য ও সংবাদকে অবিকৃত অবস্থায় সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরা। নিজস্ব চিন্তা কিংবা দল-মতের রং লাগিয়ে সংবাদকে আংশিক বা পুরোপুরি পরিবর্তন করে উল্টোভাবে পরিবেশন না করা। মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই-বাছাই করতে হয়। যে খবরটি মিডিয়ায় প্রকাশিত হতে যাচ্ছে তা আদৌ সত্য কিনা তা যাচাইয়ের নিয়ম আছে সংবাদপত্র জগতে। তথ্য যাচাই-বাছাই করার ব্যাপারে পবিত্র কুরআনেও রয়েছে চমৎকার দিক-নির্দেশনা। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কাছে যদি কোন পাপাচারী ব্যক্তি সংবাদ নিয়ে আসে তবে তোমরা তা যাচাই-বাছাই করে নাও; যাতে তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি সাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হও।’ (সূরা আল-হুজুরাত: ০৬)। সাংবাদিকদের জন্য এই আয়াতটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদকর্মীরা যদি কোনো তথ্য সঠিকভাবে যাচাই না করে মিডিয়ায় প্রচার করে দেন, তাহলে সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টি হতে পারে। যার মাসুল ঐ সংবাদকর্মী দিতে পারবেন না। যাচাই বাছাই ছাড়াই সংবাদ প্রকাশের অনেকগুলো মাধ্যমের মধ্যে একটি মাধ্যমের নাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। বর্তমানে এধরনের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক থেকে শুরু করে সবখানে বিদ্যমান। এ কারণে আল্লাহ তাআলা সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই না করে সংবাদ গ্রহণ ও পরিবেশন নিষেধ করেছেন। অনেক সংবাদকর্মী লোকমুখে যা শুনেন তাই মিডিয়ায় প্রচার করে দেন। এটিও ইসলামে নিষিদ্ধ। রাসূল সা. বলেন, ‘একজন ব্যক্তি মিথ্যুক হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে তাই বলে বেড়ায়’। (মুসলিম : ১/১০৭). খবরের সত্যতা যাচাইয়ের ব্যপারেও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ইসলামে মিথ্যা বলা মহাপাপ বা কবিরা গুনাহ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া ও মিথ্যা সংবাদ প্রচার করা কবিরা গুনাহ’- (বুখারি)। তাই সংবাদের তথ্য যাচাই ও সত্যতা নিরূপণ করা সাংবাদিকের অপরিহার্য কর্তব্য।

সর্বপরি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও শৃঙ্খলার প্রয়োজন রয়েছে। হলুদ সাংবাদিকতা প্রতিরোধে এই শৃঙ্খলা জরুরি। আর এ জন্য প্রয়োজন সাংবাদিকতার নীতিমালার সংশোধন। সংবাদপত্রে ভুল, মিথ্যা তথ্য ও উদ্ধৃতি ছাপার জন্য (প্রমাণিত হলে) সাংবাদিক (লেখক), প্রকাশক ও সম্পাদকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা থাকা দরকার। মালয়েশিয়ার আইনে ভুয়া খবর ছড়ানোর অপরাধে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ১৩০,০০০ ডলার পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

জনসচেতনায়- মোঃ সাব্বির রহমান, পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত), বাঞ্ছারামপুর মডেল থানা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

আ/জুলাই ৪ ,২০১৮

Share.

Comments are closed.