১৮ই জুন, ২০১৮ ইং যেভাবে শুরু ফুটবল বিশ্বকাপ
Mountain View

যেভাবে শুরু ফুটবল বিশ্বকাপ

0
image_pdfimage_print

ডেস্ক রিপোর্ট
নিউজবিডি৭১ডটকম
ঢাকা : ১৯০৪ সালের ২১ মে প্যারিতে প্রতিষ্ঠিত হয় ফেডারেশন ইনটান্যাশনালে ডি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। যাকে আমরা ফিফা নামেই চিনি। তবে ফুটবলের সত্যিকার একটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে তাদের সময় লেগেছিলো প্রায় তিন দশক।

কোপা আমেরিকার মতো আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা তখন নিয়মিতই আয়োজন হচ্ছে। তবে ফুটবলের বৈশ্বিক লড়াইটা কেবল দেখা যেতো অলিম্পিকেই। তাও একেবারেই আনাড়ী পর্যায়ে, পেশাদারিত্বেরও অভাব ছিলো যথেষ্ট। অথচ এই ‘কিশোর’ খেলাটিতে অনেক দেশই শক্তি যোগাচ্ছিলো। কিছু কিছু দেশ দারুণ পেশাদারিত্ব অর্জন করেছিলো ততদিনে। বিষয়গুলো স্পষ্ট নজরে আসে ১৯২৪ অলিম্পিকে যখন উরুগুয়ের দুর্দান্ত পেশাদার দলটি প্রথম ল্যাটিন আমেরিকান দল হিসেবে অলিম্পিকের টাইটেল জেতে।

এরআগে ১৯২১ সালে ফিফার তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হয়ে আসেন ফরাসি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলে রিমে আর সম্পাদক হন হেনরি দেলাওয়নে। মূলত অলিম্পিকে বিভিন্ন দেশের ফুটবলের দারুণ সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন জুলে রিমে।

১৯২৪ সালের অলিম্পিক চলাকালীন ফিফা এবং অলিম্পিক কমিটির মধ্যে এক ধরণের স্নায়ুযুদ্ধ চলতে থাকে অলিম্পিকে ফুটবল টুর্নামেন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। এসময় ফিফা ঘোষণা দেয়, তারাই বিশ্বফুটবলের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ, তাই এমন একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন করা দরকার যেটি হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল টুর্নামেন্ট।

বিষয়টি আরও সহজ হয়ে যায় যখন ১৯২৪ অলিম্পিকের ফুটবল থেকে ডেনমার্ক এবং ইংল্যান্ডের মতো দল নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। এপরই পাশ হয় হনরি দেলাওনের প্রস্তাবটি। যাতে বলা হয়, দ্রুতই একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে এবং প্রতি চার বছর পর পর অনুষ্ঠিত হবে এটি।

১৯২৯ সালে ফিফা ঘোষান দেয় যে, ১৯৩০ সালেই এই টুর্নামেন্ট আয়োজন করবে তারা। টুর্নামেন্ট আয়োজনের ঘোষণা দিলেও তখনও এর কোন নাম দেয়া হয়নি। তবে বৈশ্বিক গণমাধ্যমগুলো নিজেদের মতো করে টাইটেল ব্যবহার শুরু করে দেয়। কেউ বলে, ‘ওয়ার্ল্ড সকার চ্যাম্পিয়নশীপ’, কেউবা বলে, ‘লা কোপা ডি মন্ডে’ আবার কেউ ছাপে ‘ওয়ার্ল্ড কাপ’ নামে। কেউ আবার এটার নাম দেয়, ‘জুলে রিমে কাপ’। একসময় এটি ‘ওয়ার্ল্ড কাপ’ বা বিশ্বকাপ হিসেবেই পরিচিতি পেয়ে যায়।

ব্যাপারটা মোটেও ছোট নয়, কাজটাও নয় অতটা সহজ! ফিফার সংগঠনিক শেকড় তখনও বলতে গেলে মাটির নিচে গাড়তে পারেনি ভালোভাবে। প্রথম আয়োজন, অভিজ্ঞতা নেই, আছে দক্ষতার অভাবও। তবে আন্তরিকতা আর সদিচ্ছার অভাব নেই মোটেও। যদিও ফিফার জন্য বোঝার উপর শাকের আটি নয়, পুরোপুরি প্রকা- পাথর হয়ে দেখা দেয় অর্থনৈতিক সংকট। সত্যিকারের বৈশ্বিক একটা আয়োজনের জন্য দরকার বিশাল অংকের বাজেট!

এসময় ফিফার সহ-সভাপতি রুডল্ফ সিলড্রেয়ার্স একটি প্রস্তাব দেন। প্রথম টুর্নামেন্টের আয়োজক দেশকেই ফান্ড সংগ্রহ করতে হবে। এছাড়া অংশগ্রহণকারী দলগুলোর খেলোয়াড়, রেফারি এবং ফিফার সদস্যদের যাতায়াত এবং সেখানে অবস্থানের খরচ বহন করতে হবে। এতোবড় অর্থনৈতিক কর্মকা- যেকোনো দেশের জন্যই যে চিন্তার বিষয় সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তারপরেও বেশ কিছু দেশ এটির আয়োজক হতে ইচ্ছা প্রকাশ করে। যাদের মধ্যে ছিলো, হল্যান্ড, হাঙ্গেরি, ইতালি, স্পেন, সুইডেন এবং উরুগুয়ে। সুইডেন এবং হল্যান্ড পরে অবশ্য নিজেদের নাম প্রত্যাহর করে নেয় এবং ইতালিকে সমর্থন করে। অপরদিকে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোকে পাশে পায় উরুগুয়ে। একপর্যায়ে ইউরোপের বাকি দেশগুলোও নিজেদের গুটিয়ে নেয়। রয়ে যায় কেবল উরুগুয়ে।

ফিফার দেয়া অর্থনৈতিক শর্ত মেনে নেয়ার পাশাপাশি এক লাখ আসন বিশিষ্ট একটি স্টেডিয়ামও বানাতে রাজি হয় উরুগুয়ে। মূলত নিজেদের স্বাধীনতার শতবর্ষপূর্তি উদযাপনের জন্য যেকোনভাবে বিশ্বকাপের আয়োজক হতে চাচ্ছিলো তারা। শেষ পর্যন্ত প্রথম বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হিসেবে উরুগুয়েকে বেছে নিলো ফিফা।

অপরদিকে উরুগুয়ের ফুটবল একেবারে ফেলনা ছিলো না। ১৯২৮ এবং ১৯২৮ সালে টানা অলিম্পিকের স্বর্ণ ঘরে তুলেছিলো তারা। তবে উরোপের বেশিরভাগ ফুটবল পরাশক্তিই প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নিতে রাজি হলো না। করণ হিসেবে তারা বলল, সমূদ্রপথে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মন্টিভিডিওতে যাবে না।
নিজের দেশ ফ্রান্সকে রাজি করালেন জুলে রিমে। যুগোস্লাভিয়া, রুমানিয়া আর বেলজিয়াম এলো রাজা ক্যারলের অনুরোধে। উত্তর আমেরিকা থেকে এলো যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো। আর স্বাগতিক উরুগুয়ে ছাড়া দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চল থেকে যোগ দিলো আরও ছয়টি দেশ- ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চিলি, বলিভিয়া, পেরু এবং প্যারাগুয়ে।

মোট ১৩টি দল নিয়ে ২৩ জুলাই শুরু হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল প্রতিযোগিতা। প্রথম ম্যাচটি হয় ফ্রান্স এবং মেক্সিকোর মধ্যে। ৪-১ গোলে জেতে ফ্রান্স। বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম গোলটি করার সৌভাগ্য অর্জন করেন ফ্রান্সের লুই লরে।

অল ল্যাটিন আমেরিকা ফাইনালে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা এবং উরুগুয়ে। জাতীয় চেতনা এবং সম্মানের প্রশ্ন বড় হয়ে দাঁড়ায় দু’দলের জন্য। অতিরিক্ত নিরাপত্তা চান রেফারি এবং লাইন্সম্যানরা। অনাকাক্সিক্ষত কিছু না ঘটলেও শুরুতে একটু হট্টগোল হয়েছিলো বটে। দুই দলই নিজেদের বলে খেলা শুরু করতে চাইছিলো। কারণ, তখনও অফিসিয়াল বলের প্রবর্তন হয়নি। দুই দলের পছন্দের বলেই খেলা হতো। শেষ পর্যন্ত টসের মাধ্যমে সমাধান হয়। নিজেদের বলে খেলা শুরু করে আর্জেন্টিনা তবে শেষ পর্যন্ত জয় হয় স্বাগতিকদের। ৪-২ গোলে জিতে প্রথম বিশ্বকাটি নিজেদের করে নেয় উরুগুয়ে। স্বাধীনতার শতবর্ষপূর্তিতে এরচেয়ে ভালো উপহার আর কিই বা হতে পারে!

সেই শুরু, এরপর থেকে প্রতি চার বছর বিরতী দিয়ে হয়ে আসছে বিশ্বকাপ। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে মাঝে দু’টি আসর (১৯৪২, ১৯৪৬) বাতিল করতে হয়েছে। এপর্যন্ত মোট ২০টি আসরে শিরোপা জিতেছে মাত্র ৮টি দল। সর্বোচ্চ পাঁচ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ব্রজিল। জার্মানি এবং ইতালি জিতেছে ৪ বার করে। আর্জেন্টিনা এবং উরুগুয়ের ঘরে গেছে দু’টি করে ট্রফি। এছাড়া, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড এবং স্পেন একবার করে বিশ্বসেরার মুকুট পরেছে।

নিউজবিডি৭১/আর/ ১৪ জুন , ২০১৮

Share.

Comments are closed.