২২শে মে, ২০১৮ ইং পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় চলছে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর শাসন
Mountain View

পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়ায় চলছে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর শাসন

0
image_pdfimage_print

গাজীউল হাসান খান : পূর্বেকার কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা বর্তমান আধুনিক রাশিয়ার জনগণ অদৃষ্টবাদে বিশ্বাস করে খুব কমই। তবে রাশিয়ার রাজনীতিতে বর্তমানে ভ্লাদিমির পুতিনকে অত্যন্ত ভাগ্যবানই বলতে হবে। ১৯৯৯ সালের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে প্রেসিডেন্ট হিসেবে পদত্যাগ করেছিলেন তৎকালীন রাশিয়ার অন্যতম সংস্কার ও গণতন্ত্রপন্থী নেতা বরিস ইয়েলিসন। তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে নিয়োজিত ইয়েলিসনের হাত ধরে রাজনীতিতে আসা ভ্লাদিমির পুতিন কার্যকরী প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন। সেই থেকে অর্থাৎ ২০০০ সাল থেকে প্রায় দুই দশক কাল তিনি ক্রেমলিনের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় রয়েছেন। এবার ভ্লাদিমির পুতিন চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট হিসেবে সম্প্রতি শপথ নিয়েছেন ক্রেমলিনের বিলাসবহুল দরবার হলে। তাঁর এবারের ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হবে ২০২৪ সালে, যখন পুতিনের বয়স হবে ৭২ বছর। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত আজীবন প্রেসিডেন্ট থাকার পথে পা বাড়াবেন কি না তা এখনো জানা যায়নি। রাশিয়ার সংবিধান অনুযায়ী দুই মেয়াদের বেশি কেনো ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট হতে না পারার কারণে ২০০৮ সালে তাঁর বন্ধু দিমিত্রি মেদভেদেবকে এক টার্মের জন্য প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে দিয়ে নিজে চলে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে। তারপর ইয়েলিসনের সফল উত্তরসূরি পুতিন আবার ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তাঁর কাঙ্ক্ষিত পদে ফিরে এসেছিলেন। গণতন্ত্র ও সংস্কারপন্থী ইয়েলিসনের পর অর্থাৎ ২০০৪ সালে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভ্লাদিমির পুতিন ৭০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েছিলেন। তাঁর পেছনে ছিল রাশিয়ায় ইয়েলিসন পরবর্তী সময়ে সাধিত অর্থনৈতিক সংস্কার ও গণতান্ত্রিক ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রত্যয়। রাশিয়ার বৃহত্তর ঐক্য ও জনগণের মন জোগানোর জন্য ক্ষমতায় এসেই কাজ শুরু করেছিলেন পুতিন। ফলে ২০০৪ সাল পরবর্তী সময় থেকেই জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থা ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হার সন্তোষজনকভাবে বেড়ে যায়। পরিবর্তন দৃশ্যমান হতে থাকে রাশিয়ার অর্থনীতিতে। ক্ষমতায় প্রথম দুই টার্মে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন প্রেসিডেন্ট পুতিন। একদিকে রুবলের ব্যাপক মুদ্রামান হ্রাস এবং অন্যদিকে জনগণের আয়কর কমিয়ে ১৩ শতাংশ করা হয়। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ফোর্বসের তালিকায় বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী মানুষের শীর্ষে ছিলেন পুতিন। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টাইম ম্যাগাজিনের ১০০ জনের তালিকায় এক নম্বরে ছিলেন তিনি। তা ছাড়া ২০০৭ সালে টাইম ম্যাগাজিনে বিশ্বসেরা মানুষ হিসেবে নির্বাচিত করা হয় পুতিনকে। তবে এবার অর্থাৎ ২০১৮ সালে মার্কিন ফোর্বস তালিকার শীর্ষে চলে এসেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং। এবং তাঁর পেছনে চলে গেছেন ভ্লাদিমির পুতিন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রয়েছেন পুতিনেরও পেছনে। এ স্থান নির্ণয় করা হয় সাধারণত নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বিভিন্ন অবদান কিংবা অর্জন ও বিভিন্ন ইস্যুতে ব্যক্তিগত ভূমিকার জন্য।

উপরোল্লিখিত বিশ্বমানের প্রকাশনাগুলোতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন নেতাদের অবস্থান নির্ণয়ের মাধ্যমে তাদের নিজ নিজ দেশের আর্থ-সামাজিকও রাজনৈতিক ভূমিকাও ফুটে ওঠে। প্রকাশ পায় কূটনেতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে নেতাদের নেতৃত্ব ও তাঁদের নিজ নিজ দেশের প্রভাব-প্রতিপত্তি সৃষ্টি করার সম্ভাব্যতা। গণচীন তাদের দেশে পশ্চিমা গণতন্ত্র কিংবা সংস্কৃতিচর্চাকে তাত্ত্বিক অর্থে সেভাবে প্রয়োগ করতে রাজি নয়। তাদের রয়েছে একদলীয় কমিউনিস্ট পার্টির শাসন। তার মধ্যেই নাকি নিহিত রয়েছে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা এবং সার্বিক বিবেচনায় তাদের দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও দীর্ঘ ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ। বিশাল জনসংখ্যার দেশ গণচীন। সে হিসাবে তাদের অর্থনীতির পরিধি বা ব্যাপকতাও বিশাল। বিগত কয়েক দশক যাবৎ অর্থনীতির ক্ষেত্রে গণচীনের অব্যাহত উচ্চ প্রবৃদ্ধি, জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছে। রাজনীতির নামে শ্রমিক শ্রেণি কিংবা সাধারণ মানুষ অরাজকতা সৃষ্টির পরিবর্তে উন্নয়নের স্বার্থে স্থিতিশীলতা রক্ষার কৌশলকেই বেছে নিয়েছে বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিকনির্দেশনায়। এ বিষয়টি সম্ভব হয়েছে গণচীনে সর্বস্তরে লাগামহীন দুর্নীতি ও লুটপাটের অর্থনীতি নেই বলে। প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং সে দিকটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছেন। বর্তমানে গণচীনের লক্ষ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে গণচীনের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং বিশ্বের এক নম্বর দেশ বা পরাশক্তি হিসেবে নিজেদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। সেটি অর্থনৈতিক, সামরিক এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাসহ সব ক্ষেত্রেই। শি চিনপিং গণচীনে তাঁর নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠা করেছেন সব বিতর্কের উর্ধ্বে এবং এখন তিনি অত্যন্ত ধীর পদক্ষেপে ক্রমে ক্রমে এগিয়ে যচ্ছেন চীনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের পথে। সে তুলনায় রাশিয়ার অবস্থা এখনো সমপূর্ণ ভিন্ন। রাশিয়ায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বেশ কিছুটা উদারনৈতিকতা কিংবা বাজার অর্থনীতির প্রভাব পরিলক্ষিত হলেও সেখানে সুষ্ঠু কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রকৃত অর্থে খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। সেখানে রয়েছে ব্যাপক দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন এবং পুতিনের নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিপূজার এক বড় মাপের অভিযোগ। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে চলছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এক ‘ম্যানেজড্ ডেমোক্রেসি’ বা উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় এক কারসাজিমূলক রাজনীতি চালু রাখার প্রক্রিয়া। বর্তমানে রুশ পার্লামেন্টে কমিউনিস্ট পার্টিসহ বিভিন্ন প্রকৃত বিরোধী দলকে বাইরে রাখার চক্রান্ত চলছে বলে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। প্রেসিডেন্ট পুতিনের পছন্দমাফিক বিরোধী দলের সদস্যরাই বর্তমানে দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান দুমায় প্রবেশ করতে পারেন বলে ব্যাপক অভিযোগ ও রাজনৈতিক ক্ষোভ রয়েছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন প্রথমে ইউনিটি পার্টি এবং পরে পরিবর্তিত ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির সদস্য হয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, রাশিয়ার পক্ষে আর কোনো দিন অতীতের সোভিয়েত পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। তিনি অবাধ রাজনীতির ও পর কোনো বিধি-নিষেধ আরোপ করবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এবং এটাও বলেছিলেন যে তিনি গণতন্ত্রের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক। রূপান্তরিত রাশিয়ার আইনই হবে সর্বোচ্চভাবে বিবেচিত বিষয়। কিন্তু রাশিয়ার সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তি ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে দেশের মুক্ত গণমাধ্যমকে ধ্বংস করার। অপর দিকে তিনি সহযোগিতা করছেন সরকারপন্থী প্রিন্ট ও বিশেষ করে, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের সয়েঙ্গ, যাঁরা উদারভাবে তাঁর প্রশংসা ও বিভিন্ন প্রচারে তৎপর থাকে।

অভিযোগ উঠেছে, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অধীনে চলছে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী একটি বিশেষ গোষ্ঠীর শাসন, আভিধানিক অর্থে ইংরেজিতে যা কেবল হয় Oligarchy বা গোষ্ঠীভুক্ত ব্যক্তি। সে গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, দুর্বৃত্তায়ন ও স্বজনপ্রীতির এক অকথিত ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে বলে রাশিয়ার নেতৃস্থানীয় সংবাদ বিশ্লেষক এবং কলাম লেখকরা অভিযোগ করেছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়েলিসনের পর ক্ষমতাসীন হয়ে পর্যায়ক্রমে প্রেসিডেন্ট পুতিন ১৭ জন প্রবীণ সাবেক কেজিবি কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়ে ক্রেমলিনের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের পদে নিয়োগ দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পুতিন নিজে একসময় ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিসের প্রধান এবং রাশিয়ার সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেছেন। সর্বোচ্চ জাতীয় পর্যায়ে গোয়েন্দাগিরি ও নিরাপত্তা বিষয় নিয়ে পেশাগত জীবনের শুরু থেকেই পুতিন সুচতুরভাবে কাজ করে গেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে। সে কারণেই তাঁর সর্বোচ্চ শাসনযন্ত্র ক্রেমলিনে প্রবেশ এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলিসনের নজরে পড়া। পুতিন ক্ষমতাসীন হয়েই চেচনিয়ার মুসলিমদের মুক্তি আন্দোলনের বিরুদ্ধে এক অঘোষিত যুদ্ধ বা পৈশাচিক সামরিক অভিযান শুরু করেন। তাতে হাজার হাজার চেচনিয়াবাসীকে (আন্দোলনকারীসহ) অকাতরে হত্যা করা হয়েছে। দুর্নীতি এবং একচেটিয়া ব্যবসা ও কালো টাকার মালিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেও তেমন কোনো ব্যবস্থা নেননি প্রেসিডেন্ট পুতিন। তাদের অনেকে এখন দেশ ছেড়ে বিশাল অঙ্কের পুঁজি পাচার করে লন্ডন এবং দুবাইতে বাস করছেন। কেউ কেউ ইংল্যান্ডের বড় বড় ফুটবল টিমসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের মালিক হয়েছেন। আর বাকিরা বিশাল পরিমাণ অর্থবিত্ত নিয়ে দেশীয় রাজনীতিতে জড়িত হয়েছেন। কেউ বা খুলেছেন সংবাদপত্র কিংবা টেলিভিশন চ্যানেল, যেখানে সরাসরি ‘পুতিনবাদ’ (Putinism)) প্রচার করা হচ্ছে। সে কারণে ব্রিটেনের প্রভাবশালী দৈনিক ‘দ্য গার্ডিয়ান’ সম্প্রতি লিখেছেন, একসময় মার্ক্সবাদী বিপ্লব রপ্তানি করা হয়েছে রাশিয়া থেকে। আর এখন পুতিনবাদের আন্তর্জাতিক বাজার সৃষ্টি করার প্রয়াস চালানো হচ্ছে।

রাশিয়ার একটি সামরিক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের নাম সিলোভিকি’। তারা মূলত রাশিয়ার রাজনৈতিক এবং ব্যাবসায়িক মহলকে পরিকল্পিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। ক্ষমতা গ্রহণ করার পর অর্থাৎ ১৯৯৯ থেকে ভ্লাদিমির পুতিন অনুগ্রহ লাভের প্রত্যাশায় নিজে যেমন তোষামোদী কিংবা স্তাবকতাকে ক্ষমতার দাবা খেলায় উদারভাবে ব্যবহার করেছেন, তেমনি নিজেও অতি প্রশংসা ও তাঁর ব্যক্তিপূজাকে পছন্দ করেন। সে কারণে রাশিয়াতে, বিশেষ করে মস্কো এবং সেন্ট পিটার্সবার্গে (সোভিয়েত আমলের লেনিনগ্রাদ),পুতিনবাদ চর্চা, প্রচার ও সাংগঠনিকবাবে তাকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করার নিরলস প্রয়াস চালানো হচ্ছে বলে কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থিত কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় বলা হয়েছে।

সাম্যবাদ বা কমিউনিজমের বিরুদ্ধে এবং রাশিয়ার সনাতন কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং তথাকথিত জাতীয় মূল্যবোধ সংরক্ষণের পক্ষে কথা বলে প্রেসিডেন্ট পুতিন সংখ্যাগরিষ্ঠ রুশদের সমর্থন লাভ করেছেন। তার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ভুলে গেছেন যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এ মুহূর্তে আর কোনো বিশেষ পদক্ষেপ বা কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন। পরলোকগত প্রেসিডেন্ট ইয়েলিসন যে গণতান্ত্রিক সংস্কার, আইনের শাসন, স্বচ্ছ বা জবাবদিহিমূলক বাজার অর্থনীতির ওপর জোর দিয়েছিলেন, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এখন সে পথে হাঁটছেন না। তার পরিবর্তে তিনি নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার লক্ষ্যে পুতিনবাদের ভিত্তিতে জনসমর্থন মজবুত করার কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। তা ছাড়া বিশাল অঙ্কের কিছু গোপন বিনিয়োগের সঙ্গে তিনি নিজেই জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশ্বব্যাপী হৈচৈ বা আলোড়ন সৃষ্টিকারী পানামা পেপারসে তার কিছু প্রকাশ করা হয়েছে। তাতেও জনগণকে অর্থনৈতিক রেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কারণে ভ্লাদিমির পুতিনের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। বিগত নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এবং বিরোধীদলীয় নেতা আলেক্সি নাভালনিকে নির্বাচনের আগে দুর্নীতির দায়ে গ্রেপ্তার করার পরও দেশে কোনো আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠেনি। কারণ প্রেসিডেন্ট পুতিন সফলভাবে ইতিমধ্যে সৃষ্টি করেছেন একটি নির্ভরযোগ্য গৃহপালিত বিরোধী দল। তাদের হাতে ব্যাপক গণ-আন্দোলনের কোনো কর্মসূচি নেই। সেসব বিরোধী দলের সদস্যরাই শুধু রাজনীতিকই নন, তাঁরা প্রভাবশালী এবং সম্পদশালী ব্যবসায়ীও। এ অবস্থা অগণতান্ত্রিক ও বিশেষ গোষ্ঠীভুক্ত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ বা ‘এলিট সম্প্রদায়’ দুমায় অনুষ্ঠিত বিভিন্ন দলের গণতন্ত্র-গণতন্ত্র সাজানো খেলাকে বেশ উপভোগই করছেন। কারণ সেখান থেকে এ সম্প্রদায়ের মানুষকে উত্খাতের কোনো হুমকি দেওয়া হয় না। সুতরাং এর চেয়ে শক্তিশালী গণতন্ত্রের তাদের আর প্রয়োজন কি? বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এখন বেশ কিছুটা পড়ে গেলেও একসময় তা বহুদিন ১৫০ ডলারে থিতু হয়েছিল। সে সুযোগে ভ্লাদিমির পুতিন সাইবেরিয়ার খনি শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও ঋণ পরিশোধ করে জনগণের জন্য বিভিন্ন ছোটখাটো সুযোগ-সুবিধার সৃষ্টি করেছেন। গ্রাম ও নগরবাসীর কাছে মোটামুটি ন্যায্য মূল্যে নিত্যব্যবহার্য পণ্যসামগ্রী সরবরাহ করেছেন। অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে বেশ কিছু কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি করেছেন।

প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইতিমধ্যে যা-ই করেছেন, রাশিয়ার মতো একটি অন্যতম প্রধান পরাশক্তির জন্য তা যথেষ্ট নয়। বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা সমৃদ্ধির গতি বা পরিমাণ আন্তর্জাতিক বিবেচনায় কিংবা তুলনামূলকভাবে অনেক নিচে নেমে যাবে। এ অবস্থায় শুধু ২০২৪ সাল পর্যন্ত কেন, আজীবন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ সৃষ্টি করেও বাস্তবে বিশেষ অগ্রগতি হবে না। ভ্লাদিমির পুতিন ১৬ বছর রাশিয়ার ইনটেলিজেন্স ও নিরাপত্তার সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। সেখান থেকে তিনি রাষ্ট্রের উন্নতি, অবস্থান ও নিরাপত্তার ব্যাপারে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন, তা যদি সার্থকভাবে কাজে লাগাতে না পারেন, তা হলে শিগগিরই নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি উঠতেই পারে। অর্থবহ গণতান্ত্রিক নীতি-আদর্শ ও জনগণের অধিকারের বিষয়টি যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ত না হয়, তাহলে আইনের শাসন বাস্তবায়িত হবে না। আর যেখানে আইনের শাসন নেই সেখানে সরকারের বা কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি আশা করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্বস প্রকাশিত তালিকা কিংবা টাইম নিউজ ম্যাগাজিনে ভ্লাদিমির পুতিনকে ক’বার কিভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে কিংবা স্থান দেওয়া হয়েছে, তাতে রাশিয়ায় গণতান্ত্রিক সংস্কার ত্বরান্বিত কিংবা দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন উচ্ছেদ হয়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বর, ২০১৬-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার সাইবার কারসাজি কিংবা ফ্রান্স ও এমনকি জার্মানির নির্বাচনেও রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছিল। সে ক্ষেত্রে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কতটুকু অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হয়েছে, তা নিয়ে তো প্রশ্ন উঠতেই পারে।

প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একজন বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তি। এ কথা অনস্বীকার্য যে ভেঙে পড়া সোভিয়েত ইউনিয়ন অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেকটা দেউলিয়ায় পরিণত হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট পুতিন তার থেকে সৃষ্ট নতুন রাষ্ট্র রাশিয়াকে অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেকটা টেনে তুলেছেন। রাশিয়াতে অনেক শিক্ষিত ও প্রতিভাবান মানুষ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, শিল্পী ও সাহিত্যিকসহ নামকরা অনেক ক্রীড়াবিদ। সে শক্তিশালী রাশিয়াকে একটি অগণতান্ত্রিক অথবা স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিংবা দুর্নীতিগ্রস্ত ও দুর্বৃত্ত শাসিত সমাজব্যবস্থায় পরিণত করার অর্থ হবে অত্যন্ত আত্মঘাতমূলক। রাশিয়াকে সঠিক ও কাঙ্ক্ষিত নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যথেষ্টই রয়েছে। তবে সে ক্ষেত্রে তাঁকে বাদ দিতে হবে গণবিরোধী দুর্নীতিবাজ শোষকদের, যারা বর্তমান রাশিয়ায় একটি বিশেষ গোষ্ঠীর শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।

লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরচালক

gaziulhkhan@gmail.com

এম কে/মে ১৪, ২০১৮

Share.

Comments are closed.