জামায়াত নেতা থেকে আওয়ামী এমপি, নদভীর খুটির জোর কোথায়?

নিউজবিডি৭১ডটকম
নিজস্ব প্রতিবেদক : জামায়াত নেতা থেকে আওয়ামীলীগ সংসদ। আওয়ামীলীগের লেভাস গায়ে জড়িয়ে জামায়াতের হাতকে শক্তিশালী করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সংসদ সদস্য আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দীন নদভীর বিরুদ্ধে। তিনি সাংসদ ছাড়াও চট্টগ্রাম ভিত্তিক দাতব্যমূলক এনজিও সংস্থা আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনেরও চেয়ারম্যান। যে ফাউন্ডেশনের কাজ হচ্ছে ছাত্র শিবির ও জামায়াতকে শক্তিশালী। এ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে নদভী মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফান্ড পেয়ে থাকে। মূলত জামায়াতে ইসলামীর পরিচয়ে তিনি এ দাতব্যমূলক এনজিও সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পেরেছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নদভীকে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছিলেন জামায়াত ইসলামীর সাবেক আমীর গোলাম আযম। নদভীর শশুর মমিনুল হক চৌধুরী জামায়াতের এমপি প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য। নদভীর স্ত্রী রিজিয়া রেজা চৌধুরী বর্তমানে মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য। ছাত্র জীবনে রিজিয়া ইসলামী ছাত্রী সংস্থায় যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নদভীর বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি তার সংসদীয় অঞ্চলে জামায়াতকে শক্তিশালী করতে কাজ করছে। গায়ে আওয়ামীলীগের ব্যানার ব্যবহার করলেও কাজ করছে জামায়াতকে শক্তিশালী করার জন্য। তার সংসদ অঞ্চলে আওয়ামীলগীগ নেতাকর্মীও সরকারি কর্তাদের সাথে রয়েছে তার বিরোধ। শুধু তা নয় জামায়াত ও বিএনপির নাশকতা মামলা জড়ানো হচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের। তেমনটাই ঘটনা ঘটেছে চলতিস বছরের ফেব্রুয়ারিতে। লোহাগাড়ায় জামায়েত ও বিএনপির বিরুদ্ধে নাশকতা মামলায় স্থানীয় আওয়ামীলীগ ও যুবলীগক নেতা কর্মীসহ মোট ১৬ জনকে পুলিশ দিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে যাদের জেল খাটায় নদভী। যার অধিকাংশ আওয়ামীলীগের সক্রিয় নেতাকর্মী। তার সমস্ত কর্মকান্ড আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী।

অনুসন্ধান করে ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনের একটি সুভ্যেনিয়র (ক্রোড়পত্র) পাওয়া গেছে, যাতে দেখা গেছে নদভীর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের আমীর কাজী হোসাইন আহমদ, পাকিস্তানের জামায়াত নেতা আবদুল গাফফার, বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামের সাবেক আমীর আমীর গোলাম আজম ও মতিউর রহমানসহ জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে নদভীর একান্ত সাক্ষাতের ছবি রয়েছে।

সেখানে জামায়াতে ইসলামের সাবেক আমীর গোলাম আজম নদভীকে একটি প্রত্যয়নপত্র দিয়েছিলেন জামায়াত ইসলামীর সাবেক আমীর গোলাম আযম। গোলাম আজম নদভীকে একজন বিজ্ঞ, জ্ঞানী ও উদিয়মান যুবক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন,‘শেখ আবু রেজা নদভী। তিনি আমার পরিচিত। আমি জানি, তিনি একজন জ্ঞানী, বিজ্ঞ ও উদিয়মান যুবক। বিশ্বে বিশুদ্ধ আক্বিদায় বিশ্বাসী আলেম সমাজের মধ্যে তাঁর যথেষ্ট পরিচয় রয়েছে। আমি তার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করছি যে, মহান আল্লাহ যেন তাকে আরো বেশি ইসলামের খেদমত করার সামর্থ দেন এবং তার ইহ-পরকালীন কল্যাণ কামনা করছি। প্রফেসর গোলাম আজম, আমীর জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ।’

গেল ২০ এপ্রিল সাংসদ নদভীর বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলনে করে লোহাগাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ, সে সময় স্থানীয় নেতারা অভিযোগ করেন উপজেলা আওয়ামীলীগকে পাশ কাটিয়ে নদভী নিজ আত্মীয়-জনদের দলীয় বিভিন্ন কর্মকান্ডে ব্যবহার করছেন। তাছাড়া নদভী ও তার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীসহ সাধারণ জনগণকে নানা ধরণের মামলা-হুমকি দিয়ে ভয়-ভীতি এবং জায়গা-জমি দখলের অভিযোগও পাওয়া গেছে। এ ধরণের কর্মকান্ডে আগামী জাতীয় নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৫ থেকে নদভীকে মনোনয়ন না দিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ সাধারণ জনগণ।

এ বিষয়ে লোহাগাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খোরশেদ আলম চৌধুরী নিউজবিডি৭১কে জানান, জামায়াতের বিদেশি ফান্ডগুলো নদভী সাহেব উঠাতেন। জামায়াত থেকে তিনি মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু মনোনয়ন না পাওয়ার পর তার সাথে কিছুটা বিরোধ সৃষ্টি হয় জামায়াত নেতাদের সঙ্গে। পরে তিনি আওয়ামীলীগের ব্যানারে মনোনয়ন নেন। যেহেতু কেন্দ্রীয়ভাবে উনাকে মনোনয়ন দেয়া হয়। আর এ অঞ্চলে আওয়ামীলীগের সুনাম থাকায় আমাদের চেষ্টায় উনি জয় লাভ করে। কিন্তু জয় লাভ করার পরপরেই তিনি আবার জামায়াতের সাথে পদ পদবী ছাড়া সম্পৃক্ত হন। তার সাথে আমাদের স্থানীয় নেতাকর্মীদের কোন যোগাযোগ নেই। তার সাথে যোগাযোগ করার জন্য আওয়ামীলীগের জেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও অনেকবার চেষ্টা করলেও তিনি নানান অজুহাতে বৈঠক করেন না। শুধু তা নয় সরকারি কোন উন্নয়ন কাজে আওয়ামী নেতাকর্মীদের দিয়ে না করিয়ে উনার শশুর জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য মমিনুল হক চৌধুরীর ক্যাডারদের দিয়ে করাচ্ছেন। এছাড়া জামায়াতকে শক্তিশালী করছেন দলের ব্যানার নিয়ে। জামায়াতের সাথে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। তিনি কিভাবে আওয়ামী লীগ থেকে নমিনেশন পান, তার স্ত্রী কিভাবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হন-এগুলো আমার বুঝে আসে না। নদভী উন্নয়নের যত ফান্ড পাচ্ছেন তার অধিকাংশ অর্থ আত্নসাৎ করছেন।

সম্প্রতি লোহাগাড়ার পদুয়া ইউনিয়নে খাসজমি দখল-বেদখলকে কেন্দ্র করে নদভী ও লোহাগাড়ার ইউএনওর মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। ফলে নদভী ওই ইউএনও’র বাবা বিএনপির রাজনীতিদে জড়িত রয়েছে বলে সরকারের কাছে নালিশ করলে ১২ এপ্রিল ইউএনওকে প্রেষণে বদলির আদেশ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পরে খোঁজ নিয়ে বিষয়টি সঠিক নয় প্রমাণ পেলে ১৮ এপ্রিল আরেকটি প্রজ্ঞাপনে ইউএনওর বদলির আদেশ বাতিল করে জনপ্রসাশন মন্ত্রণালয়।

এবিষয়ে লোহাগাড়ার উপজেলার নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মাহবুব আলম নিউজবিডি ৭১ ডটকমকে বলেন, আমার বিরুদ্ধে অপপ্রাচার চালানো হয়েছিল। কিন্তু সততা ও নিষ্টার কারণে আমার কেউ ক্ষতি করতে পারেনি। আর সংসদ সদস্য আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দীন নদভী সম্পর্কে উনার এলাকার নেতাকর্মীরাই জানেন। তারাই উনার কাজ ও পরিচয় সম্পর্কে ভাল জানেন।

লোহাগাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন হিরু নিউজবিডি ৭১ ডটকমকে বলেন, একজন জামায়াত ঘরনার লোক কিভাবে আওয়ামী লীগ থেকে নমিনেশান পেয়েছেন তা আমার বোধগম্য নয়। তিনি একজন জামায়াতের লোক তাতে কোনো সন্দেহ নেই। উনি সংসদ সদস্য হওয়ার পর থেকে আমাদের স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। জেলা পর্যায়ে একাধিকবার বসার চেষ্টা করলেও তিনি বসেন নি। এখন পর্যন্ত তার উদ্যোগে কোনো সভা সমাবেশ হয়নি। আমরা যখন কোনো উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের বিষয়ে ওনাকে বলি তিনি কোনো কথা বলেন না।

হিরু বলেন, নদভী নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি আওয়ামী লীগকে এড়িয়ে চলেন। যে কেউ আসলে দেখতে পাবে তৃণমূল পর্যায়ে কারো সমর্থন তার প্রতি নেই। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিভিন্নভাবে কটাক্ক করেন। তার নিজস্ব কিছু লোক আছে। তিনি তাদের দিয়ে বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেন। আমাদের ইউএনওকে অপসারণের দাবিতেও তার নিজস্ব ব্যক্তিবর্গ দিয়ে মিছিল করিয়েছেন। অনেক বয়স্ক যুবকদের দিযে ছাত্রলীগের ব্যানারে মিছিল করিয়েছেন। তিনি যে একজন জামায়াতের লোক সেটি স্থানীয় পর্যায়ে এসে জিজ্ঞেস করলে যে কেউ বলবে। তিনি এখন আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী রয়ে গেছেন। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে নেড়ি কুত্তার সাথে তুলনা করেন। তিনি আমাদের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তার স্ত্রীও একজন জামায়াত পরিবারের সদস্য। তার শশুর জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমপি আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দীন নদভী নিউজবিডি৭১ ডটকমকে বলেন, আমি জামায়াত সাথে সংযুক্ত থাকলেও এগুলো পুরাতন কথা। আমি এসব বিষয়ে কথা বলতে চাইনা। আমি ব্যাস্ত আছি। বিদেশিদের সাথে কথা বলছি। পরে কথা হবে। আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দীন নদভী (পর্ব ১)

নিউজবিডি৭১/এম কে/মে ৩, ২০১৮