২৬শে এপ্রিল, ২০১৮ ইং উন্নয়ন, জীবনমান ও জীবনযাপন
Mountain View

উন্নয়ন, জীবনমান ও জীবনযাপন

0
image_pdfimage_print

ড. সা’দত হুসাইন
উন্নয়ন কথাটি কার না ভালো লাগে। নিজের সম্পর্কে প্রযোজ্য হলে আরো ভালো লাগে। সমস্যা হচ্ছে এর ব্যবহারিক দ্যোতনা (Nuance) ও সামগ্রিকতা নিয়ে। সাধারণভাবে ব্যক্তির জন্য উন্নয়ন বলতে বাড়তি আয়-উপার্জন বোঝায়। দেশের ক্ষেত্রেও এর অর্থ প্রায় সমরূপ। দেশের উন্নয়ন হচ্ছে বললে বোঝানো হয় যে দেশের লোকজনের সামষ্টিক আয় বাড়ছে। সামষ্টিক আয়কে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ দিলে জনগণের মাথাপিছু আয় নির্ণীত হয়। সামষ্টিক আয় বাড়লে গাণিতিক নিয়মে মাথাপিছু আয়ও বাড়ে। এর ওপর ভিত্তি করে বলা হয়, দেশের উন্নয়ন হচ্ছে। ব্যক্তির উন্নয়নের মতো এ হিসাব তত সহজ নয়। ব্যক্তির আয়-উপার্জন বাড়া, না বাড়া সম্পূর্ণরূপে তার নিজের। দেশের মানুষের গড় আয় বাড়া কিন্তু সেরূপ ব্যাপার নয়। এখানে অনেক লোকের আয় কমে গেলে বা সমান থাকলেও স্বল্পসংখ্যক লোকের আয় মাত্রাতিরিক্ত বাড়ার কারণে মাথাপিছু আয় বাড়তে পারে। মাথাপিছু আয়ের বৃদ্ধি থেকে বোঝা যায় না যে সাধারণ মানুষ উন্নয়নের ভাগীদার হচ্ছে কি না। যাদের আয়-উপার্জন বেশি, যাদের আয় বাড়ার আর কোনো প্রয়োজন নেই, তবু তাদের আয় আরো বাড়লে সাধারণ মানুষের কোনো লাভ হয় না। বরং আয় ও ভোগের বৈষম্যের কারণে তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ে। তারা এর মধ্যে অনৈতিক কর্মকাণ্ড তথা ন্যায়াচরণের ঘাটতি দেখতে পায়। এটি তাদের মধ্যে এক ধরনের সংক্ষোভের জন্ম দেয়, যা দেশের বা সমাজের শান্তির জন্য মোটেই ভালো নয়।

এসব দেখে-শুনে উন্নয়নের প্রথাগত ধারণা বদলে যাচ্ছে। নতুন নতুন ভাবনা যোগ হয়েছে। আরো যোগ হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এ ধরনের ভাবধারা আরো বহুগুণ সম্প্রসারিত হতে পারে। আয়-উপার্জনের সীমানা পেরিয়ে জীবনের বর্ধিত মাত্রায় তা স্থান করে নেবে। সেখানে উন্নয়নকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে, যা হবে অবশ্যই জীবনস্পর্শী। আয়-উপার্জন সেখানে বড়জোর একটি সাধারণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত হবে। যেসব বিষয় মানুষের জীবনকে সুন্দর করে, স্বস্তি দেয়, আনন্দ দেয়, উপভোগ্য করে, সর্বোপরি জীবনকে অর্থবহ করে, সেসব বিষয়কে এই সংজ্ঞায় আনতে হবে। বহুমাত্রিক চালকের অন্তর্ভুক্তিতে উন্নয়নের সংজ্ঞা কিছু জটিল আকার ধারণ করলেও তা হবে অধিকতর পরিশুদ্ধ এবং সবার কাছে অর্থবহ। উন্নয়ন আলোচনা তখন অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সমাজতত্ত্ববিদ, মনোবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজকল্যাণ বিশেষজ্ঞ, প্রায়োগিক গবেষক, এমনকি সুকুমারবৃত্তের বিশেষজ্ঞরাও এ আলোচনা-পর্যালোচনায় শামিল হবেন। জীববিজ্ঞানী, জীব-রসায়নবিদ ও জীব-প্রযুক্তিবিদদের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন হতে পারে।

উন্নয়নের বিষয়ে মূল আলোচনায় চলে আসে জীবনমান ও জীবনযাপন। জীবনমানের প্রধান নিয়ামক ভোগের স্তর। আয়-উপার্জন বাড়ার সঙ্গে ধরে নেওয়া হয় যে ভোগের স্তর এবং মান দুটিই বাড়বে। সরলভাবে বলতে হয়, আগে যদি ভোক্তা মোটা চাল খেত, এখন চিকন চাল খাবে। আগে পরিবারে যে পরিমাণ মাছ, মাংস, ডিম, দুধ খাওয়া হতো, এখন তার পরিমাণ বেড়ে যাবে। বাড়িঘরের কাঠামো পরিবর্তিত হবে। ছনের ঘরের ভিটিতে টিনের ঘর উঠবে। টিনের ঘরের জায়গায় পাকা দালান নির্মিত হবে। মোটরগাড়ি কেনা হবে। ঘরে ফ্যান লাগবে, আরো পরে একটি-দুটি করে এসি বসানো হবে। সিমেন্টের মেঝেতে টাইলস বসানো হবে। বাথরুম, কিচেন, ডাইনিংরুম আধুনিক ধরনের তৈরি হবে, ঘরের আসবাবপত্র বদলে যাবে, পুরনো আসবাব পরিত্যক্ত হয়ে নতুন আসবাবপত্র দিয়ে ঘর সাজানো হবে। নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের পোশাক-পরিচ্ছদে সমৃদ্ধির ছাপ পড়বে। সব কিছু মিলে উন্নত মানের ভোগ-বিলাস দৃশ্যমান হবে।

জীবনযাপনের ব্যাপারটি ভিন্নতর। এ ক্ষেত্রে মানুষের সবচেয়ে বড় চাহিদা হচ্ছে সুখ, শান্তি ও স্বস্তি; সাধারণ ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ী তা উৎপাদন করতে পারে না। কিছু জিনিস সম্পূর্ণরূপে মানসিক। ব্যক্তির নিজস্ব মনই তার মূল উৎপাদনকারী। আর কিছু বিষয়ের উৎপাদনকারী সমাজ ও রাষ্ট্র। রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, নান্দনিক পরিবেশ, সুশাসন, জীবন-সম্পদের নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক জীবন, সামাজিক মূল্যবোধ, নাগরিক সম্পর্ক ইত্যাদি হাট-বাজারে বিক্রি হয় না। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর বিস্তৃত আওতায় এসব নির্মিত হয়। রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক পণ্য সন্তোষজনক মানের না থাকলে আয় বাড়া সত্ত্বেও নাগরিক জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়তে পারে। তখন আয় বৃদ্ধি তার কাছে অর্থহীন হয়ে যেতে পারে। বাড়তি দুশ্চিন্তা ও অশান্তির কারণও হতে পারে। যেসব দেশে এ বিষয়গুলো উন্নত মানের, সেসব দেশে জীবন যাপন করতে মানুষ আগ্রহী হয়। যেসব দেশে তা নিম্নমানের, অসন্তোষজনক, সেসব দেশ থেকে মানুষ দেশান্তরিত হতে চায়। বর্ধিত আয়ের মানুষের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের চাহিদা মেটানোর জন্য তাই রাষ্ট্র ও সমাজকে বিশেষ তৎপর হতে হয়। উন্নত কর্মসূচি নতুন উদ্যোগে গ্রহণ করতে হয়।

বিদেশ ভ্রমণকালে বহু প্রবাসী বাংলাদেশিকে জিজ্ঞেস করেছি,‘আপনারা কেমন আছেন?’তাঁরা মোটামুটি সবাই নির্দ্বিধায় বলেছেন, ‘খেয়ে-পরে, চলেফিরে ভালো আছি।’তাঁরা বিদেশি মানদণ্ডে সম্পদশালী নন। তাঁদের বেশির ভাগই নিম্ন মধ্যবিত্ত। এখানে-ওখানে সাধারণ ধরনের কাজ করে। বেশির ভাগ উত্তরদাতা ভাড়া বাসায় থাকেন। দু-একজন ছোটখাটো বাড়ি কিনে নিজের বাড়িতে বসবাস করেন। ছেলে-মেয়েরা স্কুলে-কলেজে পড়াশোনা করছে। স্ত্রী নিয়মিত-অনিয়মিত চাকরি করছেন। যেসব শহরে ভালো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম রয়েছে, সেখানে সবাই গাড়ি কেনেননি। মেট্রো বা সাবওয়েতে চলাফেরা করেন। যেখানে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম তত ভালো নয়, সেখানে সবাই নতুন বা পুরনো গাড়ি কিনেছেন। নিজ গাড়িতে চলাফেরা করেন। নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্তের আয় নিয়ে তাঁরা স্বচ্ছন্দ জীবন যাপন করেন। দুই বেলা পেট পুরে বিশুদ্ধ, পুষ্টিকর খাবার খান, সকালে-বিকালে পছন্দসই নাশতা করেন, ছেলে-মেয়েদের বিদেশের নিয়ম অনুযায়ী এলাকার নির্দিষ্ট স্কুলে পাঠান, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে নানাভাবে যোগাযোগ করেন, প্রায় প্রতি সপ্তাহে প্রবাসী পাড়া-পড়শি ও পরিচিতজনের বাড়িতে লাঞ্চ-ডিনারে, আউটিংয়ে নিমন্ত্রিত হন অথবা নিজের বাড়িতে তাঁদের আমন্ত্রণ জানান। এ ছাড়া সবাই মিলে সামাজিক অনুষ্ঠান বা বিনোদন অনুষ্ঠানে যোগ দেন। বছরে ছয় মাসে একবার অবকাশ কাটাতে যান, সম্ভব হলে দু-এক বছর পর দেশে বেড়াতে আসেন। অসুখবিসুখ হলে ইনস্যুরেন্সের বদৌলতে সন্তোষজনক মানে চিকিৎসা করাতে পারেন। খাওয়াদাওয়া, চলাফেরা, বাচ্চাদের লেখাপড়া, নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা, সামাজিকতা, আপ্যায়ন, বিনোদন ইত্যাদি ব্যাপারে তাঁদের কোনো আক্ষেপ-অভিযোগ নেই। সে জন্যই বোধ হয় সোজা উত্তর, ‘খেয়ে-পরে, চলেফিরে ভালো আছি।’ বিদেশে থাকতে তাঁরা পছন্দ করেন।

দেশে পরিচিতজন, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের অনেককে একই প্রশ্ন করেছি,‘কেমন আছেন?’উত্তর পেয়েছি,‘খেয়ে-পরে মোটামুটি আছি।’ আর কিছু বলতে আগ্রহী নন। বাড়তি উচ্ছ্বাস তো দূরের কথা, চলেফিরে ভালো আছি—এ কথা বলতেও তাঁরা কেউ রাজি নন। পীড়াপীড়ি করলে শুরু হয় নানা অভিযোগ-অনুযোগের সাতকাহন। এগুলোর মধ্যে অসত্যের পরিমাণ বেশি নয়, সত্য উপাদানেই ঠাসা বক্তব্য। শুনতে যে ভালো লাগে তা নয়; কিন্তু তাঁদের বক্তব্যকে ভিত্তিহীন, অসত্য বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিনা তর্কে চুপ করে শুনতে হয়।

তাঁদের বক্তব্য সমস্বরে অনেকটা এ রকম শোনায়, এ কথা ঠিক যে আমরা দুই বেলা পেট ভরে খেতে পাই। সকাল-বিকাল নাশতা করি। কিন্তু যা খাচ্ছি তার কতটুকু খাওয়ার উপযুক্ত আর কতটুকু ভেজাল-বিষাক্ত সে সম্পর্কে কিছুই বলতে পারি না। প্রায়ই তো পত্রিকায় দেখি ফলমূল, শাকসবজিতে বিষাক্ত কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে, ওষুধেও হয় ভেজাল দেওয়া হচ্ছে, নয়তো প্রয়োজনীয় উপাদান কম দিয়ে নিকৃষ্ট মানের করা হচ্ছে; জীবন রক্ষাকারী ওষুধের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নেই। অসুখ নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে তিনি সময় দিতে চান না, কোনো কথা শুনতে চান না, শুধু একগাদা টেস্ট আর দামি দামি ওষুধের নাম লিখে কয়েক মিনিটের মধ্যে বিদায় দেন। সামান্য রোগ হলেও ভয় হয়, কার কাছে গিয়ে কোন ঝামেলায় পড়ি। রোগের চেয়ে ডাক্তারকে বেশি ভয় করি।

চলাফেরা, বিশেষ করে রাস্তায় চলা তো আতঙ্কের ব্যাপার। ফুটপাতে হেঁটে চলা কষ্টকর। কারণ ফুটপাত নানা ধরনের দোকানদার ও হকার দখল করে নিয়েছে। ছোটখাটো টংঘরও রয়েছে, স্থানীয় যুবকরা তাদের সংগঠনের নামে এগুলো গড়ে তুলেছে। নগর কর্তৃপক্ষ মাঝেমধ্যে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে চেষ্টা করে। কিন্তু স্থানীয় নেতাদের সহযোগিতায় দখলদাররা আবার ফিরে আসে। এখন ফুটপাত ধরে চলা যায় না, রাস্তার মধ্য দিয়ে জান হাতে নিয়ে চলতে হয়। গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বেরোতে গেলে বিরক্তিতে মন ভরে ওঠে। কখন, কোন স্থানে, কতক্ষণ গাড়ি থেমে থাকবে, তা কেউ বলতে পারে না। যেদিকে যে পথ ধরেই যাই না কেন, যানজট এড়ানোর উপায় নেই। চারদিকে যানজট। কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। আমরা জানি না যানজটে কতক্ষণ বসে থাকতে হবে। দিনে একটির বেশি কাজ শেষ করা যায় না, সকালে বের হলে গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে দুপুর পেরিয়ে যায়। সামাজিকতা হারিয়ে গেছে। যারা উত্তর ঢাকায় থাকে তারা জানাজা, কুলখানি বা বিয়ে-শাদির অনুষ্ঠান ছাড়া মধ্য বা দক্ষিণ ঢাকায় যাওয়ার কথা আজকাল চিন্তা করে না। যেতে-আসতে কমপক্ষে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লেগে যায়।‘ভিআইপি মুভমেন্ট’থাকলে তো কথাই নেই। আরো এক ঘণ্টা যোগ করতে হবে। এক হিসাব মতে, যানজটে দিনে ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, বছরে ক্ষতির পরিমাণ ৩৭ হাজার কোটি টাকা।

বিরক্তি আর হতাশা মেশানো কণ্ঠে তাঁরা বলতে থাকেন, আগে বলা হতো ঢাকা শহর থেকে বের হতে পারলে যানজটের আর কোনো সমস্যা নেই। মফস্বলের পথে নির্বিঘ্নে গাড়ি চালানো যাবে। এ অবস্থা একেবারে পাল্টে গেছে। এখন ঢাকা শহর থেকে বেরিয়ে উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম যেদিকে যান না কেন, আপনাকে মাইলের পর মাইল যানজটে আটকে থাকতে হবে। শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাস্তাঘাট কাজে আসছে না। ঢাকা থেকে কুমিল্লায় যেতে আড়াই ঘণ্টার জায়গায় পাঁচ-ছয় ঘণ্টা, চট্টগ্রামে যেতে পাঁচ ঘণ্টার বদলে ১০-১১ ঘণ্টা, এমনকি টাঙ্গাইল যেতেও পাঁচ ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। ভয়ে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে, এখন বছরে একবারও গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হয় না। বলুন দেখি, যানজটে এমনভাবে নাকাল হতে কার ভালো লাগে।

খবরের কাগজ খুললেই যখন খুন, গুম, অপহরণ, ছিনতাইয়ের খবর চোখে পড়ে তখন জীবন-সম্পদ সম্পর্কে শঙ্কা জাগে। খাল-বিল, নদী-নালা , মাঠ-ঘাট , সড়ক-সেতু যেভাবে দখল হয়ে যাচ্ছে, খাল বিষাক্ত পানিতে ভরে যাচ্ছে, রাস্তা সরু হতে হতে চিপা গলি হয়ে যাচ্ছে, পরিবেশ মারাত্মক পর্যায়ে দূষিত হয়ে যাচ্ছে, তখন ভয় লাগে এই পরিবেশে আমরা স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারব কি না। হয়তো পারব। বিকলাঙ্গ অনাথ ছেলে-মেয়েও বেঁচে থাকে; সময় ভালো হলে দান-অনুদানের মাধ্যমে তার রুজিরোজগারও একটু বাড়ে; কিন্তু তার জীবনযাপন প্রক্রিয়া কারো কাম্য হতে পারে না। বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে সিন্ডিকেটবাজরা; আমরা অসহায়। অফিস নিয়ন্ত্রণ করছে দুর্নীতিবাজরা, সেখানেও আমরা নীরব দর্শক।

নাগরিকের সম্পদের নিরাপত্তা দেয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানে গচ্ছিত অর্থ যদি লোপাট হয়ে যায়, তবে নাগরিকের জীবনে সুখ-শান্তি-স্বস্তি ক্ষয়ে যায়। বাড়তি আয়-উপার্জন থেকে যে উপকার পাওয়ার কথা, তা অনিশ্চয়তার ফাঁদে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে তেমনটি ঘটেছে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে।‘এত দিনে তিলে তিলে সঞ্চয় করে যা ব্যাংকে গচ্ছিত রেখেছি, তা ঠিক থাকলেই বাঁচি।’বলে ব্যক্তিবৃন্দ কিছুক্ষণের জন্য থেমে থাকলেন।

এরপর বলতে থাকলেন,‘দেড় নম্বরিতে দেশটা ভরে গেছে, অফিস-আদালত, হাট-বাজার, শহর-বন্দর সর্বত্র এরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। মসৃণ, সুন্দর প্রতিশ্রুতি দিয়ে, আশ্বাস দিয়ে তারা আশপাশের সবাইকে ঠকাচ্ছে, অর্থকড়ি হাতিয়ে নিচ্ছে। এদের থেকে ছাড়া পাওয়ার উপায় নেই। যেকোনো কাজে যাই না কেন, এদের দেখা মিলবেই এবং নানা মিহি কথায় ভুলিয়ে এরা কিছু টাকা হাতিয়ে নেবেই। সারা মুল্লুকে এদের অবাধ বিচরণ। কারো না কারো হাতে আপনি যে ঠকবেন, এতে সন্দেহ নেই। চারদিকে এমন দেড় নম্বরি লোক থাকলে শান্তিতে কি জীবন যাপন করা যায়?’ বলে ভদ্রলোক নিশ্চয় হাঁফিয়ে গেলেন।

জিজ্ঞেস করলাম,‘এত হতাশার পরও কেন দেশে রয়ে গেলেন? আপনারা তো ইচ্ছা করলেই বিদেশে পাড়ি জমাতে পারতেন।’ উত্তর পেলাম,‘শত হলেও এটি আমাদের দেশ, আমরা একে ভালোবাসি।’

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান

আ/৮ এপ্রিল, ২০১৮

Share.

Comments are closed.