স্বামী-সংসার বাঁচাতে মা-বাবার বিরুদ্ধে মেয়ের মামলা

নিউজবিডি৭১ডটকম
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট : বরিশালের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস। মালয়েশিয়া প্রবাসী খালাতো ভাই রুবেল বাড়ীতে বেড়াতে এলে বাবা-মা ষড়যন্ত্র করে তার সঙ্গে জোরপূর্বক বিয়ে দেন। দেনমোহর বাঁধা হয় ২০ লাখ টাকা। আবার বিয়ের মাস না গড়াতেই স্বামীকে ডিভোর্স দেয়ার জন্য চাপ দেন সেই বাবা-মা। মেয়ের বাসায় উপস্থিত হয়ে মেয়েকে শারীরিক অকথ্য নির্যাতন করেন মা রিনা বেগম। বাবা জালাল মেয়ে ফেরত দেয়ার জন্য আইনী নোটিশ পাঠান। তাদের কথা না শুনলে জামাই রুবেলের নামে মামলা দিয়ে জেলে পাঠাবেন, আর মেয়েকে জীবনে মেরে ফেলার হুমকি। নিরুপায় হয়ে স্বামী-সংসার ও জীবন বাঁচাতে গর্ভধারিনী মা ও বাবার বিরুদ্ধে আদালতের দারস্থ হলেন জান্নাতুল। গত ২ এপ্রিল ঢাকার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এমন একটি মামলা দায়ের করা হয়। জান্নাতুলের পক্ষে ব্যতিক্রমী এই মামলায় আদালতে আইনী সহায়তা দিচ্ছেন তরুণ আইনজীবী তামান্না আফরিন।

ঘটনার সূত্রপাত ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮। এইচএসসি পরীক্ষার্থী জান্নাতুলের বাড়ী বরিশাল সদর উপজেলার কণকাঠী গ্রামে। প্রায় দেড় মাস পূর্বে আপন খালাতো ভাই বাসায় বেড়াতে এলে মেয়ের সাথে অবৈধ সম্পর্কের অভিযোগ তুলে তাকে বাসায় চার ঘন্টা আটকিয়ে রাখেন আপন খালা ও খালু। ডেকে আনেন পাড়া-প্রতিবেশিদের। ফাঁদে ফেলে পরিকল্পনা অনুযায়ী জোরপূর্বক বিয়ে দেয়া হয়। তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী দেনমোহর ধরা হয় ২০ লাখ টাকা। প্রথমে নোটারী পাবলিক ও পরে কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ের রেজিষ্ট্রি কাবিন করা হয়। ঘটনা জানতে পেরে রুবেলের বাবা আরব আলী মেয়ের মা-বাবার বিরুদ্ধে স্থানীয় মডেল থানায় সাধারন ডায়েরী করেন।

এতোসব ঘটনার পরেও রুবেল জান্নাতুলকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নেন এবং ঢাকার ভাটারায় বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু মেয়ের বাবা-মা ফাঁদে ফেলে জামাইয়ের নিকট হতে দেনমোহরের ২০ লাখ টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিয়ের ২৭ দিনের মাথায় পিতা জালাল রুবেলের ভাগ্নেকে আইনী নোটিশ পাঠিয়ে মেয়েকে তার বাড়ীতে ফেরত পাঠাতে বলেন। মা রিনা বেগম রুবেলকে ফোন করে মেয়েকে ডিভোর্স দিতে বলেন। মোবাইলে মেয়েকে বুঝাতে থাকেন ডিভোর্স দিলে তারা বেশ কিছু টাকা পাবেন। এতে করে তাদের সংসারে আর অভাব থাকবে না। বাকী জীবনটা স্বচ্ছলতার সাথে কাটাতে পারবেন। শুধু রুবেলকে ডিভোর্স দিয়ে বাড়ীতে ফিরে আসতে হবে। টাকা আদায়ের জন্য বাকী যা যা করার তারাই করবেন। কিন্তু জান্নাতুল তার মা-বাবার কথায় কোন মতেই রাজী হলেন না। বরং জানিয়ে দেন রুবেল তাকে স্ত্রী হিসেবে অনেক ভালবাসেন। বাকী জীবনটা তার সাথেই সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে কাটাবেন। কিন্তু মা নাছোড়বান্দা। বলেন, টাকা আদায় হলে তাকে আর ভালো ঘরে বিয়ে দিবেন। কিন্তু মেয়ে সাফ জানিয়ে দেন স্বামীর ঘর ছেড়ে তিনি কোথাও যাবেন না।

জান্নাতুলকে বাগে আনতে না পেরে রিনা বেগম এবার অন্য পথে হাঁটলেন। এরপর গত ২৫ মার্চ ঢাকার ভাটারায় মেয়ের ভাড়া বাসায় রিনা বেগম উপস্থিত হয়ে মেয়েকে শারীরিকভাবে অকথ্য নির্যাতন করেন। রুবেলকে ডিভোর্স দেয়ার জন্য হুমকি দিয়ে বলেন, তাদের কথা মতো না চললে তাকে জানে মেরে ফেলা হবে। কিন্তু জান্নাতুল মা-বাবার প্রস্তাবে রাজী না হওয়ায় তার উপর বিভিন্ন্ ভাবে হুমকি ধমকি আসতে থাকে।

ঘটনাটি জানার পর জান্নাতুলকে আইনী সহায়তা দেয়ার জন্য এগিয়ে আসেন হাইকোর্ট বিভাগের তরুণ আইনজীবী তামান্না আফরিন। তিনি ২ এপ্রিল ঢাকার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রুবেলের শশুর জালাল ও শাশুড়ি রিনা বেগমের বিরুদ্ধে ফৌজাদারী কার্যবিধির ১০৭ ধারায় মামলা দায়ের করেন। মামলার বাদী তাদেরই মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস।

নারীদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আইনগত সহায়তা প্রদান করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা তরুণ আইনজীবী তামান্না আফরিন নিউজবিডি৭১কে বলেন, ব্যতিক্রমী এ মামলায় আমি আইনী সহায়তা প্রদান করছি। একটি নিষ্পাপ মেয়ের জীবন যেন অকালে ঝরে না যায় এ জন্য আদালতের দারস্থ হয়েছি। এ মামলায় আইনী সহায়তা প্রদান করে আমি গর্বিত।

তিনি বলেন, রুবেলের নিকট হতে দেনমোহরের ২০ লাখ টাকা আদায় করে আত্মসাতের জন্য মেয়ের বাবা-মা চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু জান্নাতুল তাদের প্রস্তাবে রাজী না হওয়াতে বিপত্তি। তামান্না বলেন, যেভাইে বিয়ে হোক না কেন স্ত্রী হিসেবে তাকে তার স্বামী মেনে নিয়েছে। ছোট্ট মেয়েটির জীবন কোন ভাবেই নষ্ট হতে দিতে পারি না। তাই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ঢাকার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারী কার্যবিধির ১০৭ ধারায় মামলা করা হয়েছে। আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে কারণ দর্শানো নোটিশ প্রদান করেছেন। আশা করি আমরা ন্যায় বিচার পাব।

এ বিষয়ে জান্নাতুল বলেন, স্বামী প্রবাসী হওয়ায় দেনমোহরের বিপুল অর্থ আদায়ের জন্য বাবা-মা আমাকে দিয়ে রুবেলকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু রাজী না হওয়ায় তার উপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বিয়ে যে ভাবেই হোক না কেন স্বামী তাকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নিয়েছেন। তিনি স্বামীর সাথে সারা জীবন কাটাতে চান।

নিউজবিডি৭১/এম কে/এপ্রিল ৪ , ২০১৮