১৬ই আগস্ট, ২০১৮ ইং একাত্তরে গণহত্যা: জরিপে মিলছে নতুন হিসাব
Mountain View

একাত্তরে গণহত্যা: জরিপে মিলছে নতুন হিসাব

0
image_pdfimage_print

ডেস্ক রিপোর্ট
নিউজবিডি৭১ডটকম
ঢাকা : একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সারা দেশে পাকিস্তানি বাহিনীর সংঘটিত গণহত্যার নতুন হিসাব এসেছে চলমান এক জরিপে। সেখানে মাত্র ১০ জেলাতেই মিলেছে এক হাজার ৭৫২টি গণহত্যার ঘটনার তথ্য।

শুক্রবার বাংলা একাডেমিতে এক সেমিনারে ১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টের করা জরিপের এ তথ্য তুলে ধরেন ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন।

তিনি বলেন, বিভিন্ন বইয়ে সারাদেশে গণহত্যার সর্বোচ্চ সংখ্যা পাওয়া যায় ৯০৫টি। কিন্তু জরিপে ১০ জেলাতেই এক হাজার ৭৫২টি গণহত্যার ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। আর গণহত্যার স্থানের সঙ্গে বধ্যভূমি ও গণকবর মিলিয়ে ১০ জেলার সংখ্যা দাঁড়ায় ২ হাজার ১০৭টিতে।

“দশ জেলায় সংখ্যা যদি হয় ২ হাজার ১০৭টি, তাহলে ৬৪ জেলায় সে সংখ্যা কত দাঁড়াতে পারে? তাহলে শহীদের সংখ্যা কি ৩০ লাখে সীমাবদ্ধ থাকে?”

১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টের এই জরিপ চালানো হয়েছে নীলফামারি, বগুড়া, নাটোর, কুড়িগ্রাম, পাবনা, রাজশাহী, সাতক্ষীরা, নারায়ণগঞ্জ, ভোলা ও খুলনা জেলায়।

মুনতাসীর মামুন বলেন, জরিপে গণহত্যার সঙ্গে বধ্যভূমি, গণকবর ও নির্যাতন কেন্দ্র চিহ্নিত করার কাজও তারা করেছেন।

বাঙালির মুক্তির আন্দোলনের শ্বাসরোধ করতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে এ দেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের সেই অভিযানে কালরাতের প্রথম প্রহরে ঢাকায় চালানো হয় গণহত্যা। সেটাই শুরু।

২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান। নয় মাসের যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।

যুদ্ধের ওই নয়টি মাস এই ভূখণ্ডের নানা প্রান্তে হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় দোসররা।

পরাজয় নিশ্চিত জেনে আত্মসমর্পণের দুদিন আগে তারা পরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিকসহ বহু খ্যাতিমান বাঙালিকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করে। উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতার পর যেন বাংলাদেশ যাতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে- তা নিশ্চিত করা।

জরিপে দশ জেলার মধ্যে গণহত্যার সবচেয়ে বেশি ঘটনা পাওয়া গেছে খুলনায়; সেখানে ১ হাজার ১৫৫টি গণহত্যা, ২৭টি বধ্যভূমি, ৭টি গণকবর এবং ৩২টি নির্যাতন কেন্দ্রের তথ্য পাওয়া গেছে।

নির্যাতন কেন্দ্রে গণহত্যার হিসাব আগে যেভাবে করা হয়েছে, তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন মুনতাসীর মামুন।

তিনি বলেন, আগের বইপত্রগুলোতে খুলনার গণহত্যাকে ক্রিসেন্ট জুট মিল হত্যাকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

“কিন্তু আমাদের যুক্তি হচ্ছে, সেখানে তো একদিন গণহত্যা চালানো হয়নি। প্রায় প্রতিদিন হয়েছে। সুতরাং প্রতিবার হত্যাকেই আলাদা হিসাবে ধরেছি আমরা।”

এই হিসেবে সেখানে যুদ্ধের ২৬০ দিনে গণহত্যার সংখ্যা একটি না ধরে ১০০টি ধরা হয়েছে বলে জানান তিনি।

আগের গবেষণাগুলোতে নীলফামারিতে ৫/৬টি জায়গায় গণহত্যার কথা বলা হলেও এবারের জরিপে উত্তরের এ জেলায় গণহত্যা, বধ্যভূমি, গণকবর ও নির্যাতন কেন্দ্রের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৫টিতে।

এছাড়া বগুড়ায় ১৪টির জায়গায় ১৩৯টি, নাটোরে নয়টির জায়গায় ১২৬টি, কুড়িগ্রামে সাতটির জায়গায় ৮৪টি, পাবনায় ২১টির জায়গায় ১২৬টি, রাজশাহীতে ১৮টির জায়গায় ২৬২টি এবং সাতক্ষীরায় সাতটির জায়গায় ৪১টি গণহত্যা, বধ্যভূমি, গণকবর ও নির্যাতন কেন্দ্রের তথ্য এসেছে এই জরিপে।

নারায়ণগঞ্জ ও ভোলায় এই সংখ্যা পাওয়া গেছে যথাক্রমে ২৮৮ ও ৭৪টি করে।

এ জরিপের উপর ভিত্তি করে ১০ জেলার নামে আলাদা করে ‘গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ’ নামে ১০টি বই প্রকাশ করেছে ‘গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধি বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র’।

সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর সেমিনারে বলেন, মুক্তিযুদ্ধে এদেশে জানা-অজানা অনেক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এটা তরুণ প্রজন্মকে জানাতে হবে, বিশ্বকে জানাতে হবে।

“আজ মিয়ানমারের গণহত্যাকে আন্তর্জাতিকভাবে অনেক দেশ ও প্রতিষ্ঠান স্বীকৃতি দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের গণহত্যার কোনো স্বীকৃতি নেই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা ছিল আরও ভয়াবহ। কিন্তু কোন রাজনীতির কারণে এই গণহত্যা স্বীকৃতি পাচ্ছি না- তা আমার জানা নেই।“

বাংলাদেশে রাজনীতি করতে হলে অবশ্যেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের হতে হবে মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, “পৃথিবীর কোন দেশ আছে, যেখানে কোনো দল তার দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস না করেও রাজনীতি করতে পারে? যাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে আমরা স্বাধীন হলাম, সেই পাকিস্তানেও পারবে না। তাহলে আমাদের দেশে অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্যে আমরা কেন পড়ব?”

বাংলাদেশে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ অনেকের বিতর্কিত বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির দ্রুত ‘গণহত্যা অস্বীকার আইন’ প্রণয়নের দাবি জানান।

তিনি বলেন, “ইতিহাস বিকৃতি রোধে এখনও আইন হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে আমরা তা দাবি করে আসছি, কিন্তু তার প্রতিফলন ঘটছে না। আইন কমিশন একটি খসড়া তৈরি করে দিয়েছে অনেক আগে। সেটা এখনো পাস করা হয়নি।”

১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টের করা জরিপের মত গবেষণার ফল পুস্তক আকারে বের করে দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারি উদ্যোগে পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দেন শাহরিয়ার কবির।

‘গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ’ শীর্ষক দিনব্যাপী এ সেমিনারের প্রথম অধিবেশনে অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমানের রহমানের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান ও শিল্পী হাশেম খান।

পরে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে অবসরপ্রাপপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী সাজ্জাদ আলী জহির বীর প্রতীক ও খুলনায় ১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরের প্রধান নির্বাহী কাজল আব্দুল্লাহ আলোচনায় অংশ নেন। সূত্র: বিডিনিউজ২৪

নিউজবিডি৭১/আ/ মার্চ ৩১ , ২০১৮

Share.

Comments are closed.