১৮ই আগস্ট, ২০১৮ ইং দিবসের চেয়ে চেতনার লালন জরুরি
Mountain View

দিবসের চেয়ে চেতনার লালন জরুরি

0
image_pdfimage_print

সাবিনা পুঁথিঃ অফিসের গাড়িতে বিজয় স্মরণী পার হচ্ছি। আমাদের সামনে এক গাড়ি মোটামুটি একটু ধীরে এগোয় আর রাস্তার পাশে যে মেয়েদেরই দেখে গাড়ি থেকে বোতল দিয়ে পানি ছিটিয়ে দেয়। শুরুতে খেয়াল করিনি। পরে দেখি শুধু মেয়েদের গা ভিজিয়ে দিচ্ছিল তারা। এমনকি রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া কয়েকজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদেরও। মেয়েরা কেউ কেউ চিল্লালেও সাথে থাকা বয়ফ্রেন্ড বেচারাদের কিছু করার নেই। গাড়িটিকে ফলো করা শুরু করলাম। তিন জন খুবই ইয়াং। পেছনের সিটে বসা ছেলেটাই বোতল হাতে সবাইকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। সাথে মজা করছিল চালক ছেলেটিও। তারা নোংরা ভাষায় ইভটিজিংও করছিল। তবে সামনে বসা কিশোর খুব চুপচাপ, যেন সে পছন্দ করছে না, তবে বাধাও দেয়নি। আমাদের ক্যামেরায় তখন তাদের ধরার চেষ্টা করছিলাম। আমরা সিগনালে সামনে আটকে থাকায় সেখান থেকে ফলো করছি ।

চন্দ্রিমা উদ্যানের পাশ হয়ে বিজয় স্মরণি দিয়ে জাহাঙ্গীর গেটের দিকে যাওয়ার পথে পুরো রাস্তা জুড়েই এই কান্ড করতে করতে তারা আসে। তবে আমরা তাদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। অন্য ওয়ে দিয়ে তাদের সামনে পথ আটকানোর চেষ্টায় আমরা ব্যর্থ হলাম।

কারণ ক্যামেরা দেখে গাড়ির গতি বাড়ায় এদিকে আমরা খানিক দূর থেকেই জাহাঙ্গীর গেটে অবস্থান কারী নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মনোযোগ টানার চেষ্টা করি যাতে তাদের থামিয়ে দেয়। দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে ট্রাফিকের কাছে পৌছানোর আগেই গাড়িটি বেরিয়ে যায়। পরে শুনতে পাই সেটি কোন মন্ত্রীর সোনার ছেলের কান্ড! তো সেই সোনার বিরুদ্ধে একটা লিখিত অভিযোগ দেয়া ছাড়া ওই মুহুর্তে আর কিছু করার ছিলো না।

গতকাল সোনার শুয়োর ছেলেরা জয় বাংলা উচ্চারণ করেছে। ঐতিহাসিক মুক্তির ভাষণের দিনে জয়বাংলা উচ্চরণ দিয়েই মেয়েদের সাথে যে সম্মানহীন আচরণ করেছে তা কি ৮ মার্চের প্রলেপ দিয়ে ঢাকা সম্ভব? অদিতি বৈরাগী কিংবা অনুপমারা এখন লিখছে বলে হয়তো কিছু কিছু সত্য বেরিয়ে আসছে। কিন্তু যারা বলছে না বা বলার সুযোগ পাচ্ছে না বা এই শুয়োর সোনার ছেলেদের দেশেই যাদের থেকে যেতে হবে আজীবন, প্রজন্ম ধরে, তারা কি করবে?

ইয়াংবাংলার কনসার্টে ছিলাম গতকাল। ভেবেছিলাম আর্মি স্টেডিয়ামে বরাবরেই মতোই অনুষ্ঠানে স্নিগ্ধতা থাকবে। কিন্তু তার কোন বালাই দেখিনি। মাঠের মাঝখানে একটি জায়গা আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে ভিভিআইপিদের জন্য। পুরো মাঠ জুড়ে সোনার ছেলেদের যে উন্মাদনা তা যদি সুস্থধারার হতো তবে তাতে আপত্তি ছিলো না। কিন্তু ১ ঘন্টা সময়ে যে অভিজ্ঞতায় ফিরলাম তাতে মনে হয়েছে অতিদির মতো অনেক ঘটনায় লুকিয়ে গেছে। কারণ " এত্তোগুলো ছেলেদের মাঝে এমন করে কনসার্ট দেখতে যাওয়ার দরকার কি" এমন প্রশ্নের উত্তর তারা দিতে চায়নি। যাহোক আমার পেছনে সিকিউরিটি এসএসএফ, তবে সাদা পোশাকে কেউ ছিলো কি না বলতে পারি না। তবে তারা ভিআইপিদের পাহারায় নিযুক্ত। এমন ঘটনার জন্য আমার সিক্স সেন্স আগেই সতর্ক ছিলো। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ একজন ঝামেলা বাধানোর চেষ্টা করলো। আর সোজা তারে চড় লাগাতে হলো। আমার সাহস ছিলো।

কারণ আমার হাতে আমার কাজের পরিচয় ছিলো। কিন্তু ঐ মুহুর্তে একটা মেয়ের জন্য যে কোন ঘটনায় ঘটতে পারতো যদি তারা সংখ্যায় বেশি না হয়। এতোটা ভিড়ের মধ্যে কেউ লাঞ্ছিত হলেও দেখার কেউ নেই। কারণ পেছনে ভিআইপি নিরাপত্তা জরুরি। আমজনতা কে মরলো, কে বাঁচলো তা তো জনপ্রতিনিধিদের বিনোদনের সময় দেখার সুযোগ নেই। তাদের নিরাপত্তা আগে। খুব স্বাভাবিক, ভিআইপিদের পেছনে ছুটতে হয় বলেই তো সাধারণের কয়েকশর ভাগে একজনকে নিয়ে কাড়াকাড়ি।

যাহোক চেতনার দশা নিরাপত্তায় মুড়ালেও তা কাজে আসবে না। আর এসব দিবস টিবসকেও ফালতু মনে হবে। দেখা যাবে নারী দিবসের ব্যানারের আড়ালেই নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। তাই নিদিষ্ট দিবস নয় সারাবছর সারাজীবন প্রজন্মের পর প্রজন্মে চেতনার লালন করা জরুরি। ধরুন ওই কনসার্টটিতে ৫০% মেয়ে ৫০ % ছেলে তখন কি পরিস্থিতি ভিন্ন হতো না? কাজেই ২ উপায়ে এমন সমস্যা মোকাবিলা করা যেতে পারে। ১. মেয়েদেরই বের হয়ে আসতে হবে আত্নবিশ্বাসের সাথে।

২. নিজের নিরাপত্তায় নিজের চিন্তার উপর নির্ভর করতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সবসময় সৎ সাহস থাকতে হবে।

না হলে ফালতু এসব দিবসে ঠোঁটে লিপিস্টিক মাইরা সঙ সেজে কয়েক মিনিটের জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে আবার পূর্বের অবস্থানে ফিরে যেতে হবে। আর অতি উৎসাহী ভীতুদের মতো অন্য নারীর বিরুদ্ধে আরেক নারীর কাছে নিন্দা করতেই সময় চলে যাবে।
লেখকঃ গণমাধ্যমকরমী।

আর/৮ মার্চ ২০১৮

Share.

Comments are closed.