শোকসভা দীর্ঘকালের আত্মপরিচয় ইমরান মাহফুজ

নিউজবিডি৭১ডটকম
উপমা : ইমরান মাহফুজ। একজন কবি, গবেষক ও সম্পাদক। জন্ম কুমিল্লায়। থাকেন ঢাকায়। ভাবেন মা মাটি মানুষ নিয়ে।‘কালের ধ্বনি’সম্পাদনা করছেন গত ৭ বছর ধরে। বই বেরিয়েছে এই পর্যন্ত ৭টি। সম্প্রতি আবুল মনসুর আহমদ ও আবদুল কাদির নিয়ে কাজ করে দেশব্যাপি পরিচিতি পান। বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সম্পাদনা সহায়কগ্রন্থ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে ৩ বছর ধরে। ২০১৮ বইমেলায় আসছে ঐতিহ্য থেকে নতুন ধারার প্রথম কবিতার বই দীর্ঘস্থায়ী শোকসভা। সার্বিক বিষয়ে আলাপ করেন কবি ইমামুল মোত্তাকিন।

আপনার বেড়ে উঠার গল্পটা কেমন ছিলো ?
আসলে মানুষের বেড়ে উঠা বটবৃক্ষের মত। বৃক্ষ এবং মানুষের মাঝে পার্থক্য হল অনুভবের জায়গায়। আমার বেড়ে উঠা গ্রামে, পরিবারিক বন্ধন এখনো অটুট। আমার বাবা একজন শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধা। তিনি শেখাতেন কিভাবে পরিশীল ভাবে বেড়ে উঠতে হয়। সেই অনুভবের বীজ আমাদের মাঝে রুয়ে দিয়েছেন শৈশবে। তাছাড়া বাবার দিনলিপি লেখার অভ্যাস। বছরের শেষ দিন বাবার লাভ এবং লোকসানের হিসাব জানান। তেমনি করে আমাদের পরিবারে অর্থের প্রাচুর্য্যের চেয়ে পারিবারিক বন্ধন, আবহের প্রাচুর্য্য বেশি।

আপনি কিছুকাল আরবি শিক্ষায় দীক্ষিত ছিলেন। আবার বাংলা মাধ্যমে পড়েছেন। কিন্তু স্বশিক্ষিত পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। বিষয়টি নিয়ে কী বলবেন-
বৃত্ত ভাঙতে হলে বৃত্তের বাইরে যেতে হয়। বিদ্রোহী হতে হয়। নজরুল যদি বৃটিশদের সাথে বিদ্রোহীতা না করতেন তাহলে ‘বিদ্রোহী’ পেতাম কিনা সন্দেহ। প্রতিটি বৃত্তই কিন্তু একটা বিদ্রোহ দাবি করে। আমার জন্ম ৯০ এর দশকে। বাবার জন্ম আমার জন্মের অনেক আগে। ফলে স্বাভাবিকভাবে বাবার এবং আমার চিন্তা ফারাক থাকবে। এবং স্বাভাবিক ভাবে সংঘাত বা অভিমান হয়েছিল পরিবারের সাথে। আর গতানুগতিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সবাইকে উর্বর করে না। ফলত আমি আমি হয়ে উঠতে চাইছি কবিতা গল্পে কালের কন্ঠস্বর হয়ে উপস্থিত থাকতে চাই।

এবার আপনার কাজের প্রসঙ্গে আসি। সম্পাদনায় কেন এলেন ?
আমরা সেরা সম্পাদক হিসেবে কাদেরকে চিনি- আহসান হাবীব, আব্দুল মান্নান সৈয়দ কিংবা আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। একটা কথা বলে রাখা ভাল, কালের ধ্বনি বের করার আগে আমি একটি পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলাম। তখন ঐ পত্রিকার সম্পাদক বিভিন্ন লেখকের লেখা সংগ্রহ করতে বলতেন। লেখা সংগ্রহ করতাম। কিন্তু দেখা গেল ঠিক সময় পত্রিকা বের হচ্ছে না। জুলাই এর সংখ্যা বের হ্েচ্ছ আগস্টে। কমিটমেন্ট নেই। এতে লেখকেরা জিজ্ঞেস করতো তাদের লেখা সম্পর্কে। আমাকে তখন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হতো। বিব্রতকর পরিস্থিতি বেশিদিন যেতে দেয়নি। ছোটবেলা হতে মানুষদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষমতা ছিল। যেহেতু লেখা সংগ্রহ করার কারনে লেখকদের সাথে সম্পর্ক ছিল। সেই সাথে নিজস্ব চিন্তা সব সময় আকুপাকু করতো। বন্ধু হুসাইন আজাদ ও অনার্য মুর্শিদের হাত ধরে ‘কালের ধ্বনি’র যাত্রা । আর আমি মনে করি, পৃথিবীর প্রত্যেক লেখক মাত্রই একজন সম্পাদক। আমার একজন লেখক হওয়ার যে স্বপ্ন, সে কারনে সম্পাদনায় আসা। কালের ধ্বনি একটি বৃক্ষ আর আমি তার নিচে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছি।

কালের ধ্বনি এর প্রথম সংখ্যাগুলো ছিল গল্প, কবিতা ইত্যাদি দিয়ে। কিন্তু ক্রমেই দেখছি বিষয় ভিত্তিকভাবে বের করছেন। কি মনে করে বের করা?
ছোটবেলা হতে আমার একটা চিন্তা ছিল যে, আমি যদি একজন ডাকাতও হই আমি যেন এলাকার সেরা ডাকাতই হই। যেন সবাই আমাকে চিনতে পারে। আমি চাইতাম ব্যতিক্রম কিছু করতে। গতানুগতিক হতে আলাদা যেন সবাই কালের ধ্বনিকে আলাদা করে জানুক। একটা উদাহরণ দিচ্ছি আমরা যখন অসুস্থ হই তখন একজন বিশেষজ্ঞ এর কাছে যাই। ধরুন আমার চোখের সমস্যা আমি কিন্তু চক্ষু বিশেষজ্ঞ এর কাছেই যাব। আমি আর সবার মত হতে চাইনি। তাই আমি বিষয় ভিত্তিক ভাবে এগিয়ে যেতে চেয়েছি। মনে করি একজন আবুল মনসুর আহমদ, আবদুল কাদির কিংবা জসীমউদদীনকেকে পূর্ণভাবে জানতে হলে এরকম বিষয়ভিত্তিক কাজ প্রয়োজন।

আপনি একবার, একটা অনুষ্ঠানে বলেছিলেন আপনি বাংলা সাহিত্যের সমকাল এবং চিরকালে সমন্বয় করতে চাচ্ছেন। হঠাৎ কেন মনে হল এটা প্রয়োজন ?

সাহিত্যের দুইটি চিরায়ত ধারা হল সমকালীন এবং চিরকালীন ধারা। এ দুইটি ধারাকে একজন তরুণ সাহিত্যিকের জানা প্রয়োজন। তাকে চিরকালীন প্রভাব বুঝতে হয় এবং সমকালিন ধারা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয়। এ দুইটিকে সমন্বয় করার প্রয়াস কালের ধ্বনির। এ দুইটি বিষয় যদি একজন তরুণ জানেন এতে তার সুবিধা হয়। সমকালে তার পাশে কারা লিখছেন, কি লিখছেন, কি ভাবছেন এবং অতীতে কারা লিখতেন, কি লিখতেন এখনো কেন তারা আমাদের মাঝে বিরাজ করছেন, এসব বুঝতে পারবেন।

একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ পল সার্ত্রের একটি বই আছে,‘কার জন্য আমরা লিখি’। নোবেল বিজয়ী লেখক ইমরে কার্তেজ এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন,‘লেখকেরা নিজের জন্য লেখেন’। ওরহান পামুক বলেছিলেন, তার নিজের শিশু মনকে বাঁচিয়ে রাখতে তিনি লিখেন। আপনি কি মনে করেন ?
একজন ব্যবসায়ি ব্যবসা করেন ক্রেতার জন্য। ক্রেতা আসলে বিক্রি হবে, না আসলে হবে না। কোন কোন ক্ষেত্রে লেখকেরা ব্যবসায়ির মতো। আমি মনে করি, লেখকেরা পাঠকের জন্য নয়, নিজের জন্যই লেখেন। নিজের ভিতরের অনভব/ জ্ঞানের বুদবুদকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে চান। বলতে পারি লেখকেরা নিজের জন্যই লেখেন। প্রতিটি লেখকেই চান, তার পদচিহ্ন পৃথিবীতে থাকুক।

বাংলা সাহিত্যের এত ভালো ভালো সাহিত্যকর্ম থাকা সত্তেও কেন বিশ্বসাহিত্যে জায়গা পাচ্ছে না। আপনার কি বক্তব্য এ ব্যাপারে ?
আমি মনে করি আমাদের সামগ্রিক ব্যর্থতার কারনে। আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে এব্যাপারে। শুধু সরকার নয় লেখক কিভাবে লিখছেন, কত বড় ক্যানভাসে লিখতে পারছেন তার উপর নির্ভর করে। আমাদের অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধি না পেলে বাংলা সাহিত্য বিশ্বদরবারে পৌঁছাবে না।

সে ক্ষেত্রে অনুবাদ এর ভূমিকা করতটুকু ?
অনুবাদ একটা অংশমাত্র। সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। এখানে শুধু লেখক বা অনুবাদক নন সবার সমাগ্রিক প্রচেষ্টাই পারে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে পৌঁছাতে।

একজন তরুন হিসেবে এ সময়কার তরুন লেখকেদের কিভাবে মূল্যায়ন করবেন ?
এ সময়কার তরুন লেখকদের চিন্তার উন্মেষ ঘটেছে। মুক্তচিন্তার ক্ষেত্রে ব্যাপকতা বেড়েছে। আমি নিজেই একজন তরুন। তাই বলতে পারি, এ সময়কার তরুন লেখকরা বর্তমানের সাথে চলতে পারে তারা তাদের সময়কে ধরে রাখতে চেষ্টা করছে। অনেকের লেখা দেখে আমার সরল হিংসা হয়।

২০১৭ সালে আপনার “লালব্রিজ গণহত্যা” বইটি বের হয়েছে। এটা কি দায়বদ্ধতা থেকে করা?
আমি ঠিক নিজের আত্ম পরিচয় খোঁজ করতে কাজটি করেছি। আমরা ১৯৭১ এ স্বাধীন হতে কি পরিমাণ অত্যাচার ভোগ করতে হয়েছে, কতপ্রাণ কিভাবে দিতে হয়েছে তা আমরা হয়তো জানি। পৃথিবীকে জানাতে চাই। এটা একধরনের দায়বদ্ধতা নয়, আমি নিজেকে জানতে চাচ্ছি ইতিহাসের মাধ্যমে। মুক্তিযুদ্ধের অজানা অধ্যায় লালব্রিজ গণহত্যা। এ বিষটা এতটাই মর্মান্তিক যে, ২০০০ হাজার এর উপর লাশ একসাথে ছিল। পাঠ্যপুস্তক তো দুরের কথা ঠিক সেভাবে দৈনিক পত্রিকাতেও আসেনি। বন্ধুবর পিন্টু রহমাননের বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত দিয়ে সাহায্য করেছেন। অনেকে অনেক ভাবে সাহায্য করেছেন। কৃতজ্ঞতা জানাই।

ঐতিহ্য থেকে নতুন ধারার প্রথম কবিতার বই দীর্ঘস্থায়ী শোকসভা সম্পর্কে বলুন।
মানুষ গল্প বলতে ভালোবাসে। আর জীবনের গল্পে সময় হাওয়ায় ওড়ে। আমি ত্রিচোখে জীবনের সমীকরণে দেখা অদেখা গল্পে হারিয়েছি দিগন্তে। মা মাটি মানুষের সাথে মিশে নিয়েছি নিজেকে। আত্মপরিচয়ের জন্য কাল থেকে কালান্তরের নায়কদের চাপাথাকা জীবন ও কর্মের গল্প জেনে কবিতায় বলেছি। আমার কাছে গোমটবাঁধা অন্ধকার থেকে দেয়াল টপকে আলোর দুয়ারে দাঁড় করায় কবিতা। সেই ভাবনায় প্রথম কবিতার বই‘দীর্ঘস্থায়ী শোকসভা’প্রকাশ হবার পর ব্যাপক সাড়া জাগায়।

প্রথম মুদ্রণ শেষ হয়ে যায় খুব দ্রত। দ্বিতীয় মুদ্রণে মাধ্যমিক সকাল : গাছের ছায়ায় মাছের জীবন, উচ্চমাধ্যমিক সকাল : মেঘের আয়োজনে নগরে মিছিল, ও সম্মান সকাল : মুখোশের পাঠশালায় ঘাসফুলের কান্না এই তিনটি পর্বে ৬০টি কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। একজন মানুষের জীবনকাল তিনটি ধাপে ভেবে উপশিরোনামে নতুন একটি ফর্ম উপস্থাপন করেছি। আর মহাকালের চাইতে সমকালের জীবন দুপুরে পৌঁছতে পারে না। ফলত আমার দেখা জীবনকে সকালরূপে দেখে চেষ্টা করছি অস্তিত্বের উপস্থিত করার। তবে জীবনের জয়গানে কবিতাগুলো মা মাটি মানুষ, নদী, নারী, প্রকৃতি, সমাজ ও রাষ্ট্র ও রাজনীতিসহ আমার দেখা একযুগের (২০০৫-২০১৭) জীবন নিয়ে লিখিত। এক কথায় শোকসভা আমাদের দীর্ঘকালের আত্মপরিচয়।

নিউজবিডি৭১/আর/১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮