২১শে নভেম্বর, ২০১৭ ইং বরিশালে যুবকের রহস্যজনক মৃত্যু, মামলা, তদন্তে ও আসামী গ্রেফতারে ধীরগতি

বরিশালে যুবকের রহস্যজনক মৃত্যু, মামলা, তদন্তে ও আসামী গ্রেফতারে ধীরগতি

0

নিউজবিডি৭১ডটকম
বরিশাল থেকে ফিরে, মো. রিপন মিয়া: বরিশালের বানারীপাড়ার সালিয়াবাকপুরে ওমর ফারুক বাবুর রহস্য জনক মৃত্যুতে ৭ই সেপ্টেম্বর থানায় অপমৃত্যু মামলা হলেও তা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে জানা যায়।

এ ঘটনায় ফেরদৌসি পারভিন রানু, মো. জগলুল ফারুক হাওলাদার মো. শহিদুর রহমান, ফাতেমাতুজ জোহরা ওরফে রেশমা সহ আরও অজ্ঞাতনামা ৫/৬ জনের বিরুদ্ধে বরিশাল বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট গোলাম ফারুক গেল ২২ অক্টোবর ১৫৬ ধারায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ প্রদান করেন।

জানা যায়, ওমর ফারুক বাবু অধিকতর নেশাগ্রস্ত থাকত। তার পরিবার বাবুকে ১৭ মাস রাজধানীর ঢাকা উত্তরা রি-লাইফ রিহ্যাবিটেশন সেন্টার ফর ড্রাগ এডিকসন এন্ড সেন্টার হেলথ কেয়ারে রাখে। ৬ মাস থাকার ওমর ফারুক বাবু সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু নিহতের মা ফেরদৌসি পারভিন রানু তাকে আরও ৫ মাস তাকে রি-হ্যাপ সেন্টারে রাখে। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখা আইনগত নয়।

ঢাকা উত্তরা রি-লাইফ রিহ্যাবিটেশন সেন্টার ফর ড্রাগ এডিকসন এন্ড সেন্টার হেলথ কেয়ার এর পরিচালক(নাম দিবে) জানান, তার প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ৯ মাস বাবু থাকার পর তার মা ফেরদৌসি পারভিন রানু ৭ই সেপ্টেম্বর সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় বাড়ী নিয়ে যাওয়ার কথা বলে ছাড়পত্র নিয়ে যায়। ছাড়পত্র নেয়ার ২ ঘণ্টা পর ধানমন্ডি থেকে তার মামা ফোন করে জানান যে বাবু বাহিরে গিয়ে নেশা করে মৃত্যু শয্যায়।

বাবুকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সময় যে এ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করা হয়েছিল।

সে এ্যাম্বুলেন্সে থাকা মো. এনামুল হক ……জানান, সেদিন বাবুর মায়ের সাথে তার ছেলেকে পাবনা মেন্টাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চুক্তিতে তিনি সকাল ১০টায় রি-হ্যাপ সেন্টারে এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে উপস্থিত হয়। কিন্তু বাবুর মা এক ঘণ্টা পরে রি-হ্যাপ সেন্টারে উপস্থিত হয়। পরে তারা পাবনা উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথে বাবুর মা ফেরদৌসি পারভিন গাড়ী থামিয়ে টয়লেটে গিয়ে ১ ঘণ্টা দেরিতে ফিরে আসে। পরে বাবুর মা মির্জাপুর-টাঙ্গাইল রোডে সকাল-সন্ধ্যা হোটেলে দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য অফার করে। এসময় এনামুল হক ও তার সহযোগী রহমান, ইসতিয়াক ও ড্রাইভার সোহেলসহ আমরা খেতে গেলেও বাবুর মা গাড়িতে ছিলেন। এ সময়ে ওমর ফারুক বাবুও গাড়ীতে ঘুমাচ্ছিলেন। পরে আধ ঘণ্টা পর খাওয়া-দাওয়া শেষে গাড়ীর নিকট এসে দেখে যায় বাবুর অবস্থা আশংকা জনক। এসময় ওমর ফারুক বাবু বলছিল, আমার মা আমাকে নাভিতে ইনজেকশন পুশ করেছে, আমি মরে যাচ্ছি আমাকে বাঁচান। এসময় আমরা ফেরদৌসি পারভিনকে জিজ্ঞেস করলাম আপনি কেন ইনজেকশন পুশ করেছেন, কি পুশ করেছেন? বাবুর মা বলেন, বাবু বিরক্ত করছিল তাই তাকে প্যাথিডিন পুশ করেছিলাম।

পরে এনামুল ও তার সহযোগীরা পাবনা না গিয়ে বাবুকে বরিশালে নিয়ে যাওয়ার জন্য জোর প্রস্তাব জানায়। এ ঘটনার পর বরিশাল না গিয়ে ধানমন্ডি মানসিক জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেল কর্তব্যরত ডাক্তার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। হাসপাতালে নেয়ার পথে বাবু হাসপাতালে মারা যান। জানা যায়, ড্রাইভার সোহেলকে এ্যাম্বুলেন্স বরিশালে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ৫০হাজার টাকা ঘুষ প্রদান করার প্রস্তাব করেছিলেন।

মামলার বাদী মোসা. তানজীলা জানান, তার স্বামী মাদক সেবন করলেও স্বাভাবিক জীবন যাপন করত এবং উগ্রপন্থী ভাবে চলাফেরা করত না। পরিকল্পিত ভাবে তার স্বামীকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে ও তার সাড়ে ৩ বছরের সন্তান আয়াতুল্লাহকে পিতার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে বাবুকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।

তিনি আরো জানান, তার শ্বশুর শেখ আর মজিদ দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর যাবত অসুস্থ থাকায় একটা সময় তার শাশুড়ি সমস্ত সম্পত্তি পাওয়ার নামা দলিল করে নেয় যাতে কেনা-বেচা করতে পারে। গত সেপ্টেম্বর মাসে তার শাশুড়ি বরিশাল শহরে ১ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকার সম্পত্তি বিক্রয় করেন। এর আগে তিনি একাধিক সম্পত্তি বিক্রয় করেছেন।

তিনি আরো বলেন, জমি বিক্রয়ের ঘটনা তিনি তার স্বামীকে ফোনে জানালে তার শাশুড়ি(ফেরদৌসি পারভিন) ক্ষিপ্ত হয়ে যায় এবং পরে তিনি মোবাইল কেড়ে নিয়ে সিম নষ্ট করে দেয়। পাশাপাশি বাবুর সঙ্গেও যোগাযোগ করতে তিনি দেননি। উল্টো দেখা করতে চাইলে শাশুড়ি বলতেন, বাবু বলে হয়ে যাবে। সে সুস্থ হয়ে গেছে। পরে উপায় না দেখে বাবাকে(মো. হুমায়ূন কবির) সাথে নিয়ে বাবুর সাথে রি-হ্যাপ সেন্টার দেখা করি। এসময় বাবু জানিয়েছিল, সে খুব সুস্থ আছে। কিন্তু রি-হ্যাপ সেন্টারের ডা. শফিকুল ইসলাম বাবুর অবস্থা ভাল নয় বলে ছাড়পত্র দেননি। উল্টো রাগারাগি করেন।

তানজীলা আরও জানান, তার শাশুড়ির সঙ্গে আল হেলাল দাখিলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক প্রিন্সিপালের সাথে পরকীয়া প্রেম ছিল। যা বাবু জেনে যায়। পরে এ নিয়ে বাবুর সাথে তার মায়ের একাধিক কথা কাটাকাটি হয়।

ওমর ফারুক বাবুর মামা জগলুল ফারুক হাওলাদার জানান, তার বোন ফেরদৌসি পারভিন রানু তার নিজ সন্তানকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করলে তার সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত।

তিনি আরো জানান, বাবু মৃত্যুর পরপর তাকে সংবাদ দেওয়া হয় এবং বাড়ীতে গিয়ে মৃত দেহ দেখে সন্দেহ হলে তিনি বানাড়ীপাড়া থানায় ফোন করেন। পরে পুলিশ এসে লাশ ময়না তদন্তের জন্য মর্গে নিয়ে যান।

বরিশাল জেলা পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম জানান, বানারীপাড়া থানায় অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে মা তার ছেলেকে হত্যা করেছে প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বানারীপাড়া ওসি সাজ্জাদ হোসেন জানান, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষীতে মনে হচ্ছে ফেরদৌসি পারভিন রানু তার ছেলে ওমর ফারুক বাবুকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করেছে। কিন্তু ময়নাতদন্তের রির্পোট ছাড়া এখন কিছুই বলা যাচ্ছে না। তবে আদালতে নির্দেশনায় এজাহার ভুক্ত করে আসামী গ্রেফতার করে প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা হবে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাজী মো. নজরুল ইসলাম জানান, ছেলের মৃত্যুতে মায়ের যেমন আহাজারি থাকার কথা তার কোন লক্ষণ দেখা যায়নি। উল্টো তাড়াতাড়ি লাশ দাফনের ব্যস্ততা দেখা যায়। তাই সন্দেহ হয়। পরে লাশ ময়না তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ময়না তদন্তের পর মৃত্যুর কারণ জানা যাবে।

নিউজবিডি৭১/এম/ ১ নভেম্বর ২০১৭,বুধবার

image_print
Share.

Comments are closed.