২৩শে অক্টোবর, ২০১৭ ইং নরসিংদীতে ট্রাফিক পুলিশের প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি

নরসিংদীতে ট্রাফিক পুলিশের প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি

0

নিউজবিডি৭১ডটকম
সাইফুল ইসলাম রুদ্র, নরসিংদী করেসপন্ডেন্ট : নরসিংদীতে দিন দিন বেড়েই চলছে ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজি। এমনকি দিনের বেলা প্রকাশ্যে মাধবদী, শেখেরচর, পাঁচদোনা, ভেলানগর, আরশিনগরসহ নরসিংদী পৌরসভার বাসষ্ট্যান্ড এলাকাগুলোতে দেখা যায় ট্রাফিক পুলিশ বিভিন্ন গাড়ি থেকে অবৈধভাবে চাঁদা হাতিয়ে নিচ্ছে। দিনের চেয়ে রাতে নরসিংদীর রাস্তায় চলে পুলিশের ব্যাপক চাঁদাবাজি। নরসিংদীর প্রবেশপথগুলো যেন ট্রাফিক পুলিশের অবৈধ টাকার কারখানা।

পুলিশকে মাসোহারা দিয়ে চলছে ফিটনেসবিহীন যানবাহনগুলো। এ জন্য যানজট নিরসনের পরিবর্তে প্রতিদিন তা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। তারা বলছেন, ট্রাফিক পুলিশ যত্রতত্র যানবাহন থামিয়ে কাগজপত্র চেক করার নামে চাঁদা আদায় করে। নরসিংদীর বিভিন্ন রাস্তায় প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, সিএনজি অটোরিকশা এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন নানা ব্র্যান্ডের গাড়ি কারণে- অকারণে থামিয়ে কাগজপত্র দেখার অজুহাতে হয়রানি করে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটক রাখার ফলে নরসিংদীর ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসহ বিভিন্ন সড়কে যানজট আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। গাড়ির কাগজপত্র চেক করা নয়, সাধারণ মানুষকে হয়রানি আর টাকা আদায়ই তাদের মূল টার্গেট বলে ভুক্তভোগীরা জানান। রাস্তায় লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা ফিটনেসবিহীন যাত্রীবাহী বাস চলাচল করলেও সেদিকে তাদের নজর নেই। ফিটনেসবিহীন যাত্রীবাহী বাস আটক করা হচ্ছে না।

অভিযোগ রয়েছে এসব ফিটনেসবিহীন বাসের চালক ও মালিকদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা মাসোহারা নিচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ। আর এ মাসোহারার জোরেই রাস্তায় চলাচল বন্ধ হচ্ছে না লক্কড়-ঝক্কড় ফিটনেসবিহীন যানবাহন। চাঁদাবাজির বিষয়টি ট্রাফিক পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শওকত আলী পাঠান অস্বীকার করেছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সার্জেন্ট মেহেদী হাসান গণমাধ্যম কর্মীদেরকে ম্যানেজ করার অপচেষ্টা করেন। টার্মিনাল ও সড়কসমূহে চাঁদাবাজি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা থাকলেও নরসিংদীর সড়কসমূহে দেখা যায় ভিন্ন অবস্থা। সিসি ক্যামেরা ফুটেজ থাকা স্বত্ত্বেও ট্রাফিক পুলিশেরা আইন অমান্য করে দীর্ঘদিন যাবত অবৈধভাবে চাঁদা আদায় করে চলেছে। কতিপয় সার্জেন্ট, ট্রাফিক ও পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে সচেতন মহল অভিযোগ করেন, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কথা থাকলেও সেরকম কর হচ্ছে না।

নরসিংদী সদরে বসবাসকারী ব্যবসায়ী দিদার বলেন, ভেলানগর থেকে মাধবদী আসতে একটি প্রাইভেটকারকে ৪ থেকে ৫টি পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশের তল্লাশি মোকাবেলা করতে হয়। কোনো ধরনের কারণ ছাড়াই গাড়ি থামিয়ে অবান্তর প্রশ্ন করা হয়। আবার ট্রাফিক পুলিশের দাবি করা টাকা দিলে কোনো কাগজপত্র না থাকলেও অনেক গাড়ি ছেড়ে দেয়া হয়। এছাড়া রাতের বেলা চলে ট্রাক থামিয়ে বেপরোয়া চাঁদাবাজি চলে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্রাক ড্রাইভার অভিযোগ করে বলেন, শুধু দিনে নয় রাতেও চলে ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজি। সিটি করপোরেশন ও বিআরটিএ নরসিংদীতে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচলের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে। এতেও চলছে ট্রাফিক পুলিশের বাণিজ্য।

বিআরটিএর অভিযান টিম যে রাস্তায় থাকে ট্রাফিক পুলিশ তা আগেই ড্রাইভারদের জানিয়ে দেয়। এতে করে ফিটনেসবিহীন গাড়ি ওই রাস্তা এড়িয়ে অন্য রাস্তায় চলে যায়। পুলিশ ফিটনেসবিহীন বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযান শুরু করেনি। এ জন্য অনেকেই পুলিশের চাঁদাবাজিকেই দায়ী করছেন। কারণ হিসাবে তারা বলছেন, এসব যানবাহন চলাচল বন্ধ হলে পুলিশের অবৈধ বাণিজ্য কমে যাবে।

সাহেপ্রতাব এর প্রাইভেটকারের চালক বাবুল বলেছেন, ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজিতে তারা অতিষ্ঠ। সাহেপ্রতাব থেকে মাধবদী যেতে পাচদোনা, শেখেরচর, মাধবদীতে কমপক্ষে ৩-৪টি স্থানে ট্রাফিক পুলিশের মুখোমুখি হতে হয়। কারণে-অকারণে গাড়ি থামিয়ে মামলা দেয়ার ভয় দেখায়। টাকা দিলে সব ঝামেলা চুকে যায়।

নরসিংদী সদর এলাকার রেন্ট-এ কারের ব্যবসায়ী লিমন জানান, তার ৩টি মাইক্রোবাস এবং ১টি প্রাইভেটকার ভাড়ায় চলে। তিনি বলেন, রেন্ট-এ কারের ব্যবসা করতে গিয়ে তাকে নানামুখী হয়রানির শিকার হতে হয়। ট্রাফিক পুলিশকে নিয়মিত চাঁদা না দিলে গাড়ি রিকুইজেশনের নাম করে আটক করে নিয়ে যায়। আবার রাস্তায় নানা অজুহাতে প্রতিদিনই পুলিশ টাকা আদায় করে। না দিলে ভয়ভীতি দেখানো হয় চালককে।

সরেজমিন দেখা গেছে, গত বুধবার বেলা পৌনে ২টার দিকে নরসিংদীর প্রবেশপথ পাচদোনা, সাহেপ্রতাব মোড়ে কিছু ট্রাফিক পুলিশ ট্রাক থামিয়ে চাঁদা আদায় করছে। আশেপাশের মানুষেরা আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের উপর ক্ষিপ্ত হতে দেখা যায়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পুলিশের এ চাঁদাবাজি নিত্যদিনের। কারো তোয়াক্কা না করে শুধু দিনে নয়, রাতভর চাঁদা নিতে তৎপর থাকে কিছু ট্রাফিক সদস্য। প্রতিটি ট্রাক থেকে ন্যূনতম ১০০ থেকে শুরু করে ১০০০ টাকা বা তারও বেশি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। অন্যদিকে রাতের বেলা নরসিংদী পুরাতন বাসষ্ট্যান্ড পৌরসভা এলাকার সামনে, ভেলানগর বাসষ্ট্যান্ড, পাচদোনা, সাহেপ্রতাব মোড় এলাকাগুলোতে যানবাহন থামিয়ে পুলিশকে টাকা আদায় করতে দেখা গেছে। পাঁচদোনা মোড়ে ট্রাফিক পয়েন্টে পুলিশ দিনে-রাতে যানবাহন থামিয়ে চাঁদা আদায় করছে। অতি তুচ্ছ কারণে রাতের বেলা রাস্তায় চলতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন যানবাহন চালকরা। বিভিন্ন যাত্রীবাহী বাস, মিনিবাস, প্রাইভেটকার, সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ট্রাক ও লরি থেকে প্রতিদিন মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে নরসিংদীর পাঁচদোনা জোনের ট্রাফিক পুলিশ। পাঁচদোনা জোনে ট্রাফিক পুলিশের বেপরোয়া চাঁদাবাজির কারণে যেমন পরিবহনের মালিক ও যাত্রীরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন তেমনি যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে পুলিশই যানজট সৃষ্টি করছে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, সার্জেন্টরা বিভিন্ন পরিবহন থেকে বেপরোয়াভাবে চাঁদাবাজি করছে। পাঁচদোনা জোনে ট্রাফিক পুলিশ সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজি করছে। এছাড়াও ঢাকা থেকে সিএনজি অটোরিকশা পাঁচদোনা প্রবেশ করলেই সার্জেন্টদের চাঁদা দিতে হয়। মাসিক হিসাবে ঐসব সিএনজি অটোরিকশার মালিকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে ট্রাফিক পুলিশ। তারা প্রতিটি সিএনজি অটোরিকশা থেকে ১ হাজার টাকা করে মাসিক হিসাবে আদায় করছে। যানবাহনের চালক, কন্ডাক্টর ও হেলপাররা জানান, কোনো রুটের যানবাহনই চাঁদামুক্ত নয়। বরং চলাচলকারী সব গাড়িকে প্রতি ট্রিপেই নির্ধারিত অঙ্কের চাঁদা পরিশোধের পর টার্মিনাল ছাড়তে দেয়া হয়। সে ক্ষেত্রে দূরপাল্লার কোচ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদাবাজি দিতে হয় ট্রাফিক পুলিশকে। লোকাল সার্ভিসের প্রতিটি গাড়ি থেকে ট্রিপে আদায় করা হচ্ছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। বিভিন্ন রুটে চলাচলরত গাড়ির মালিক-শ্রমিকরা জানান, কমিটি দখল ও মাত্রাতিরিক্ত চাঁদাবাজির অত্যাচারে মালিকরা পথে বসতে চলেছেন। শ্রমিকদের আয়ও কমে গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মালিক বলেন, নরসিংদী থেকে ছেড়ে যাওয়া ভৈরব, সিলেট, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন দূরপাল্লার রুটে এখন গাড়িপ্রতি ১২৫০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হচ্ছে। পুলিশ ও স্থানীয় চাঁদাবাজরা মিলেমিশে এসব চাঁদার টাকা ভাগাভাগি করে। একশ্রেণির পরিবহন শ্রমিক, চিহ্নিত সন্ত্রাসী, পুলিশ ও ক্ষমতাসীন মহলের আশীর্বাদপুষ্টদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে সম্মিলিত চাঁদাবাজ চক্র। তাদের কাছেই জিম্মি হয়ে পড়েছে যানবাহন চালক, মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই। ফলে বন্ধ হচ্ছে না ফিটনেসবিহীন যান চলাচল। ফিটনেসবিহীন যানবাহন থেকে ট্রাফিক সার্জেন্টরা টাকা তুলে মাসোহারা হিসেবে। তাই এগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাফিক পুলিশের ঊর্দ্ধত্বন কর্মকর্তা বলেন, এটি মিথ্যাচার। ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে মালিক সমিতির কাছ থেকে কেউ টাকা নেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। যদি কেউ এর প্রমাণ দিতে পারেন তবে তিনি ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

নিউজবিডি৭১/এম/২৬ সেপ্টেম্বর , ২০১৭

image_print
Share.

Comments are closed.