২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং পাহাড়ের বোবাকান্না : দেখার কি কেউ নাই?

পাহাড়ের বোবাকান্না : দেখার কি কেউ নাই?

0

নিউজবিডি৭১ডটকম
মোঃ হাবিবুর রহমান (সুজন) : উঁচুনিচু সবুজে ঘেরা পাহাড় মাঝ দিয়ে একেঁবেকে চলছে পাহাড়ি নদী। মাঝে-মাঝে ঝরনার চপলা পায়ে ছুটে লাল নূপুরের ছন্দ। যেদিকে তাকানো যায় সবুজ আর সবুজ। খারাপ মনটাও ভালো হয়ে যায়। সবুজের সান্নিধ্যে। বুকভরে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়। যে নিঃশ্বাসে নেই ধুলোবালি, নেই সীসা, নেই কোনও কালো ধোঁয়ার বিষ। নির্মল বাতাসে তাজা হয়ে ওঠে দেহমন। তবে বর্তমান প্রকৃতিক এই অপার সৌন্দর্যেও লেগেছে অসুন্দরের ছোঁয়া স্থানীয় প্রভাবশালীদের পাহাড় দখলের প্রতিযোগিতায় উঁচু পাহাড় সমসতল হয়ে গেছে আর তা প্লট বানিয়ে বিক্রি চলছে। পাশাপাশি পাহাড় জ্বালিয়ে করা হচ্ছে জুমচাষ।

পাহাড় আর পাহাড়ি নদীর দুপাড়ের বিস্তীন অঞ্চল ছেড়ে গেছে মরননেশা তামাকের চাষ। আবার পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হচ্ছে ইটের ভাটা। এর মাটি যাচ্ছে শহরে কোন নিচু জমি ভরাট করে সুরম্য অট্টালিকা তৈরির জন্য। পাহাড়ের গায়ে মানুষের বসতি গড়ে ওয়অর কারণে জীববৈচিত্র্য রয়ছে হুমকির মুখে। নানা প্রজাপতির বৃক্ষরাজি হারিয়ে পাচার ও ধ্বংসযজ্ঞে। অনিন্দ্য সবুজের বিবর্নতা নিয়ে ফ্যাকাশে মূখে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড় আমাদের অসচেতন কর্মকান্ডের সাক্ষি হয়ে। পাহাড়ি বনাঞ্চলের একসময় মুখরিত ছিল হরিন, বান, হনুমান, ময়ূর, টিয়া, ময়না, খরগোশ, শুকর, বন মুরগি, বিভিন্ন ধরনের সাপ, ব্যাঙসহ অসংখ্য পাখি, আর যেমন, বানর এই সব বনঞ্চলের সুন্দরয্য। দেখা যায় না বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদকুল।

জীববৈচিত্র্য পাহাড় আজ ন্যাড়া মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। পতঝরা মহীরুহের মতো ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী জীবন-জীবিকার তাগিদে পাহাড়ের গায়ে যে জুমচাষ করছে জীবন বৈচিত্র্য ধ্বংসের ক্ষেত্রে তাও গাছের চারা। কখনও কখনও জুমচাষ করতে গিয়ে বনাঞ্চলে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে এমন ঘটনা বিরল নয়। সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চলছে এসব কাজ। ফলে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস ও উপকারী কীটপতঙ্গ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের গা থেকে। পাহাড়ের অবয়ব দাঁড়াচ্ছে রক্ত-মাংস ছাড়া মানুষের কঙ্কালের মতো। পাহাড় ধসে প্রাণ হানির ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বর্ষা মৌসুমে প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড়ের মাটি ক্ষয়ে মেশে ঝরনা, ছড়া ও পাহাড়ি নদীসহ বিভিন্ন নদীতে। ফলে নদীর নাব্য হারিয়ে যাচ্ছে সৃষ্টি হচ্ছে বন্যার।

অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড় ধসে মৃত্যুর আশঙ্কা নির্মম বাস্তবতা হলেও একই ঘটনা ঘটছে বার বার। তাজা প্রাণ মাটি চাপা পড়ে প্রায় প্রতি বছরই বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। বৃষ্টিপাতের এই মৌসুমে যে প্রাণহানি হবে না তা জোর দিয়ে বরা যায় না। পাহাড়ি বন অর্থনীতিতে কাঠের ব্যবসা গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে। প্রভাবশালী ও একশ্রেণীর অসাধু বন কর্মকর্তা যোগসাজশ করে মূল্যবান কাঠ কমমূল্যে বিক্রি করে পাহাড়ি বন উজাড় করছে। এরপর রয়েছে বনদস্যুর অপত্য পরতা। তারা বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে গোপনে পাচার করছে। আবার ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী ও সমতল ভূমির মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে ইচ্ছেমতো পাহাড়ের বৃক্ষরাজি ধ্বংস করছে। পরিবেশ আইন পাহাড় কাটা নিষিদ্ধ হলেও নির্বিচারে চলছে মাটি সংগ্রহের কাজ।

এসব মাটি ইটভাটা, রাস্তা মেরামত ও নিচু জমির ভরাটসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাহাড়ের মাটি কাটার ফলে বৃক্ষরাজি হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্থ। ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। বৃষ্টিপাতের ফলে নামছে ধস। বেড়ে যাচ্ছে পাহাড় ধসে মৃত্যুর আশঙ্কা। পাহাড়ের ওপর ও পাদদেশে দিন দিন ঝুঁকিপূর্ন বসতি বেড়েই চলেছে। অবৈধভাবে বিক্রি হচ্ছে পাহাড়ে বসতি স্থাপনের জায়গা। মানুষের বসতির কারণে যেমন জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে তেমনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস করছে মানুষ।

২০০৭ সালে ১১ জুন প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড় ও দেয়াল ধসে ১৩২ জনের প্রাণহানির পর গঠন করা হয়েছিল পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি। ওই কমিটির মাধ্যমে পাহাড়ে বসবাসকারী অধিবাসীদের সরিয়ে নেওয়া বা বিকল্প কোনও আবসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। ১২টি পাহাড়ে ৬ শতাধিক ঝুঁকিপূর্ন বসতি চিহ্নিত হলেও গত সাত বছরে উল্লেখযোগ্য কোনও কাজ হয়নি। বরং দিন দিন পাহাড়ে মানুষের বসতি বেড়েই চলেছে।

গত বছর চট্টগ্রামের পাহাড় ধসের আশঙ্কায় থাকা ছিন্নমূল মানুষদের জন্য বিভিন্ন জায়গায় তাঁবুর ব্যবস্থা করেছিল। এবছর বৃষ্টি মৌসুমে সরকারের কী পরিকল্পনা আছে তা এখনও জান যায়নি। পাহাড় মানুষের আহারে পরিনত হচ্ছে। আর পাহাড়ের আহারে পরিনত হচ্ছে ছিন্নমূল অসহায় মানুষ যারা পাহাড়েরর ওপর ও পাদদেশে বসবাস করছে।

মানবাতার কারণে এই ছিন্নমূল মানুষদের পূর্নবাসন করতে হবে। পাহাড় কাটা, পাহাড়ি বৃক্ষ উজাড় করা, অবৈধ বসতি স্থাপন বন্ধ, কাঠ পাচার রোধ করতে সরকারি নজরদারি জোরদার করতে হবে। মানুষের ভেতর সচেতনতা তৈরি করতে নিতে হবে। মানুষের ভেতর সব নানাবিধ উদ্যোগ। এই উদ্যোগে শামিল হয়ে প্রকৃতির সাম্যবস্থা বজায় রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।

নিউজবিডি৭১/এম/১১ সেপ্টেম্বর , ২০১৭

image_print
Share.

Comments are closed.