২৫শে নভেম্বর, ২০১৭ ইং মশা কি সত্যিই এত শক্তিশালী যা আমাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব?

মশা কি সত্যিই এত শক্তিশালী যা আমাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব?

0

হাবিব : নাকি আমরাই মশাগুলোকে শক্তিশালী হতে সহায়তা করছি? আমরা যেখানে সেখানে ময়লা ফেলছি। অলিগলির প্রায় প্রতিটি দালানের পিছনে (মেথর প্যাসেজ) টনকে টন ময়লা আর্বজনা দেখা যায়। যারা উপর তলায় বসবাস করেন, নিঃসংকোচে ব্যর্জ সব নিচে ছুঁড়ে ফেলে দেন। বাড়িওয়ালারাও কিছু বলেন না, যেখানে ভাড়াই তাদের আসল চাওয়া।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন মেথর প্যাসেজে থাকা ময়লা স্তোপগুলো সরানোর উদ্যোগ নিলেও যে দালানগুলো থেকে ইতিমধ্যে ময়লা সরানো হয়েছে, সেখানে নতুন করে ময়লা জমতে শুরু করেছে। বাড়িওয়ালাদের সচেতনতার পাশাপাশি বাজারগুলোকে এখনো ব্যর্জ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা যায়নি। ক্রেতা বিক্রেতাদের ইচ্ছামতো ময়লা করা থেকে বিরত রাখতে সুনির্দিষ্ট কোন নিয়ম নীতিও নেই। বাজারগুলোকে স্যানিটেশন (ব্যাপক অর্থে) বিষয়ে সচেতন করা গেলে, আমাদের পরিবেশ উন্নতি হতে বাধ্য।

তবে, সিটি কর্পোরেশনগুলো সচেতনতা আনয়নে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করলেও তেমন উন্নতি করতে পারেনি। তাই এই খাতে এনজিওগুলোকে অংশীদার করা যেতে পারে। এক একটি এনজিও এক একটি বাজারকে নিয়ে কাজ করতে পারে। আর বাড়িওয়ালাদের সচেতনতা আনয়নে ওয়ার্ড ভিত্তিক এক বা একাধিক এনজিওদের দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। এনজিওদের সচেতনতামূলক কর্মকান্ডে র্দীঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকায়, কাজ করতে খুব একটা প্রস্তুতির দরকার হবে না।

প্রতিটি ওয়ার্ডে অনেক ক্লাব সমিতি থাকে, পরিবেশ উন্নয়নে কাজ করতে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকেও উদ্বুদ্ধ করতে হবে। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদেরকে ব্যর্জ ব্যবস্থাপনায় সচেতন করতে অন্যতম শক্তি হিসেবে ধরে নিয়ে কাজ করতে হবে যাতে প্রতিটি বাড়িতে পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতামূলক বার্তা পৌছায়।

যানবাহন আর যাত্রীদের মাধ্যমেও শহরে প্রচুর ব্যর্জ সৃষ্টি হয়। যানবাহন সমিতিকে পরিবেশ বিষয়ে সচেতন হতে প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। প্রতিটি গাড়ির ড্রাইভার আর হেলপাররা সচেতন হয়ে উঠলে, তারাই যাত্রীদের সচেতন করে তুলবে।

দেশে অবকাঠামো নিমার্ণসহ কোন উন্নয়ন কর্মকান্ড চলাকালিন সময়ে এক ধরনের অসাবধানতা আর অবহেলায় ফেলে রাখতে দেখা যায়। কর্মএলাকাগুলো অরক্ষিত রাখার ফলে পথচারি আর শিশুদের জন্য ঝুঁকিতে পরিণত হওয়ার পাশাপাশি রোদ বৃষ্টির দিনগুলোতে মশামাছি প্রজননের উপযোগী জায়গা হিসেবে গড়ে তোলা হয়। আমাদের সকল ধরনের উন্নয়ন কর্মকান্ডকে পরিবেশ বান্ধব উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে সকল সিটি কর্পোরেশন সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকে দায়িত্ব নিতে হবে।

তেমনিভাবে শহরের প্রতিটি ঘরের কাজের সহায়তাকারী ছেলে বা মেয়েদেরকে পরিবেশ বিষয়ে সচেতনতা আনয়নে কমপক্ষে একদিনের প্রশিক্ষণের বাধ্যবাধকাতায় আনতে হবে। ওয়ার্ড ভিত্তিক এনজিওরা দায়িত্ব পেলে এমন ধরনের প্রশিক্ষণ প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। কারন আমাদের সমাজে গৃহকর্মীদেরকেই ঘরের ময়লা আবর্জনা অপসারণ, বাগান পরিচর্চা আর ঘরবাড়ির আশপাশ পরিস্কার রাখার কাজ করতে হয়।

তাছাড়া বর্তমানে শহরের প্রতিটি মহল্লায় ব্যর্জ অপসারণের জন্য ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে এক ধরনের ব্যবসার প্রচলন রয়েছে। তাদের সংগ্রহ ও অপসারণ প্রক্রিয়াকে আরো গতিশীল ও আধুনিক করতে সিটি কর্পোরেশনগুলো প্রশিক্ষণসহ নানা সহায়তার পাশাপাশি উদ্যোগগুলোকে উৎসাহ যোগাতে পারে।

ব্যর্জ অপসারণ কর্মীদের নানা ধরনের ঝুঁকি এড়াতে প্রশিক্ষণ প্রদানের পাশাপাশি উপযোগী গামবুট, গ্লাভস, ক্যাপ বিনামূল্যে সরবরাহ করা যেতে পারে এতে কর্মীরা কাজে উৎসাহ পাবে এবং কাজ করতে অধিক স্বাচ্ছন্দবোধ করবে।

মশা নিধনকারী কর্মীদের কাজের গুনগত মান উন্নয়নের জন্য প্রতিটি মহল্লায় কিছু সমাজকর্মীদের সাথে যোগসূত্র করে দেয়া যেতে পারে যাতে মশা নিধনকারী কর্মীগণ সংশ্লিষ্ট এলাকার সমাজকর্মীদের নিকট নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরী হয়।

কিছুদিন আগে ঢাকা শহরে সরকারি বেসরকারি মেডিকেলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। অনেকে এই ধরনের কার্যক্রমকে সমালোচনা করলেও আমি মনে করি, আমাদের প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ভলান্টিয়ার কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হতে উৎসাহিত করা উচিত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সেবামূলক নানা কার্যক্রমে যুক্ত করতে দেখা যায়। দেশের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন নিয়োগে এই ভলান্টিয়ার কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেয়া শুরু করলে ছাত্রছাত্রীদের মাঝে উৎসাহ তৈরী করবে।

সিটি কর্পোরেশন মশা নিধনের লক্ষ্যে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরী করতে পারে। যে পরিকল্পনায় প্রতিটি মহল্লায় সপ্তাহে কোন দিন, কোন সময়ে, কতদিন মশা নিধনকারীগণ কাজ করবে তার উল্লেখ থাকবে। পাশাপাশি কর্পোরেশন কর্মীদেরকে মশা নিধন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়াও জরুরী। যাতে তারা বুঝতে পারে কোথায়, কোন অবস্থাতে এডিস মশা সহ অন্যান্য মশার বংশ বিস্তার হয়ে থাকে।
সর্বোপরি, আমাদের দেশে প্রতি বছর ২৫ এপ্রিল বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পালন করা হলে ও মশা বাহিত অন্যান্য রোগের জন্য গুরুত্ব দিয়ে কোন দিবস পালন করতে দেখা যায় না। London School Of Hygiene and Tropical Medicine কর্তৃক স্যার রোনাল্ড রস এর অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর ২০ আগস্টকে বিশ্ব মশক দিবস (World Mosquito Day) হিসেবে পালন করে থাকেন। মশা নিধনে আমাদেরও এমনি একটি দিবস পালনের চিন্তা ভাবনা করা যেতে পারে, যে দিবসটির প্রধানতম লক্ষ্যই হবে মশা বাহিত সকল রোগ প্রতিরোধে গণসচেতনতা গড়ে তোলা। কারণ মশা এখন আর শুধুমাত্র ম্যালেরিয়া রোগের কারণনয় জিকা আর চিকুনগুনিয়ার ন্যায় ভয়াবহ রোগেরও জীবানু বহনকারী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক ৫ ফেব্রুয়ারি ১৬ তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০০৭ হতে ফেব্রুয়ারি ২০১৬ পর্যন্ত মোট ৪৪টি দেশে জিকা ভাইরাস উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ছোটবেলায় ম্যালেরিয়া আর এখন চিকুনগুনিয়ার অভিজ্ঞতা প্রাপ্ত হিসেবে আমার ভয়ের তালিকায় এক নম্বয়ে মশাবাবু। মশাবাবু কাউকে ছাড়ে না ছাড়েও নি। আমাদের জাতীয় কবি ১৯২৬-২৭ সালে ম্যালেরিয়ার ভুগেছিলেন। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি মশার ভয়ে বিশাল মশারিতে হাঁটাহাটি আর লেখালেখি করতেন (দেখুন: সৈয়দ আবুল মকসুদ, প্রথমআলো ১৮ জুলাই, ২০১৭)। কবি গুরু বিশাল মশারিতে থাকতেন কেননা ছোটবেলায় ডেঙ্গু জ্বরের ভয়ে কলকাতা ছেড়ে পেনেটিতে ছাতুবাবুর বাগানবাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। যা তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন তার জীবনস্মৃতিতে (দেখুন : রবির নীড় দেশে বিদেশে, প্রত্যূষকুমার রীত, ২০১৩)।
এখন মশার মোকাবেলা করা ছাড়া ভয়ে অন্য কোথাও পালিয়ে থাকার বাস্তবতাও নেই। সবার পক্ষে চিকিৎসা, সঠিক চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগও কম। মশার সমস্যা ছিল বর্তমানে আছে ভবিষ্যৎতে থাকছে তা নিশ্চিত করে বলা যায়। তাই শুধুমাত্র ম্যালেরিয়া আর চিকুনগুনিয়া বলেই নয়, মশা বাহিত সকল ধরনের রোগ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে সরকারি আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরী। কেননা আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার কারনে আজকালকার শিশুরা ইতিমধ্যে গৃহবন্দী হয়ে পড়েছে । পড়ালেখার চাপে শিশুদের নিয়মিত শরীরচর্চা আর খেলাধুলা একটি স্বপ্নের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে আর এই মশা নিধন করতে ব্যর্থ হলে আমাদের সকলকে মশারি বন্দী হতে হবে।

৩১ আগস্ট , ২০১৭

image_print
Share.

Comments are closed.