২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং কৃষক, কৃষিবিদ ও এদের সহযোগিদের সম্মিলিত প্রয়াশেই আজকের স্বয়ম্ভর বাংলাদেশ!

কৃষক, কৃষিবিদ ও এদের সহযোগিদের সম্মিলিত প্রয়াশেই আজকের স্বয়ম্ভর বাংলাদেশ!

0

কৃষিবিদ ড. আখতারুজ্জামান : স্বাধীনতা অর্জনের সাড়ে চার দশক পরে দেশ আজ বহু ক্ষেত্রে বহুদুর এগিয়েছে।কৃষি, শিক্ষা, বিদ্যৎ,রাস্তা-ঘাট,ভৌত অবকাঠামো, তথ্য প্রযুক্তিসহ অনেক ক্ষেত্রে দেশের প্রভূত উন্নতি হয়েছে; মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, বেড়েছে আর্থিক সক্ষমতাও; ঈর্ষণীয় উন্নতি হয়েছে কৃষির সকল সেক্টরে; আর এই উন্নতির পথিকৃৎ হিসেবে কাজ করেছে এদেশের সাধারণ কৃষক এবং তাদেরকে নিত্য নতুন লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করেছেন, কৃষিবিদ, ডিপ্লোমা কৃষিবিদ ও তাদের সহযোগিরা ।এ উন্নতি অভাবনীয়!ফলে খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ম্ভরের দেশে পরিণত হয়েছে।জাতীয় পরিমণ্ডল থেকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্বকীয়তায় স্থান করে নিয়েছে বাংলার কৃষি।

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে এ দেশে আবাদযোগ্য জমি ছিল ১ কোটি ৮৫ লক্ষ হেক্টর এবং মোট খাদ্য উৎপাদন ছিল ৯৫ লক্ষ মেট্রিক টন। বর্তমানে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৮৫ লক্ষ হেক্টর অথচ দেশে এখন খাদ্যশস্য উৎপাদন হচ্ছে ৩ গুণেরও বেশি; ভুট্টাসহ এর পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি মেট্রিক টন। ১৯৭১ সালে দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি আর বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ১৬ কোটিতে। এখনো প্রতি বছর দেশে সংযোগ হচ্ছে ২৪ লক্ষ নতুন মুখ। তা সত্বেও আমাদের কৃষি কিন্তু মুখ থুবড়ে পড়েনি, মাথা উচুঁ করে সগৌরবে চলমান রয়েছে।কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমি কমতে থাকার সাথে সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে অনন্য উদাহরণ। ধান, গম ও ভুট্টা বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই ‍দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে চলছে বাংলার কৃষি।

প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ। কেবল উৎপাদন বৃদ্ধিই নয়, হেক্টরপ্রতি ধান উৎপাদনের দিক থেকেও অধিকাংশ দেশকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ।আমন, আউশ ও বোরো ধানের বাম্পার ফলনে বছরে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টন খাদ্যশস্য উৎপাদনের রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বে গড় উৎপাদনশীলতা প্রায় ৩ টন, আর বাংলাদেশে তা ৪.১৫ টন। হেক্টরপ্রতি ভুট্টা উৎপাদনে বৈশ্বিক গড় ৫.১২ টন সেখানে বাংলাদেশে এ হার ৬.৯৮ টন।একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল চাষের দিক থেকেও বাংলাদেশ এখন বিশ্বের জন্য উদাহরণ। জাতিসংঘ সহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বের জন্য উদাহরণ হিসেবে প্রচার করছে। দেশে গত এক যুগে রীতিমতো সবজি বিপ্লব ঘটে গেছে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্য মতে, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়।

ফুল চাষের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনায় বাংলাদেশের কৃষি। স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশে ফুলের ব্যবহার ছিল খুবই সীমিত।স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে মানুষের জীবনযাত্রা মানোন্নয়নের সাথে এবং রূচিবোধের বিকাশ সাধনের পাশাপাশি ফুলের ব্যবহারও বাড়তে থাকে। বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ফুলচাষের শুভসূচনা হয় যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলা থেকে। সে এক ইতিহাস। ১৯৮৩ সালে যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা গ্রামে ৩০ শতক জমিতে রজনীগন্ধা ফুল চাষের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ফুল চাষের গোড়াপত্তন করেন জনাব শের আলী সরদার। বর্তমানে যশোর জেলার ৫ টি উপজেলার ৭৫ টি গ্রামের ৪৫০০ জন কৃষক রজনীগন্ধা, গোলাপ, গাঁদা, গ্লাডিওলাস, লিলিয়াম, রডস্টিক, জারবেরা বিভিন্ন জাতের ফুলের চাষ হচ্ছে। সারা দেশের মোট ফুল চাহিদার ৭০% পূরণ হচ্ছে যশোর এলাকার উৎপাদিত ফুল হতে। বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ৩৭টি জেলায় কমবেশি ১৮ ধরনের বেশি ফুল উৎপাদন হয়। ২০ টির অধিক দেশে আমাদের ফুল এখন রপ্তানি হচ্ছে।

ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের সফলতাও বাড়ছে। ১৯৭০ সাল থেকে দেশি জাতকে উন্নত করে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা উচ্চফলনশীল (উফশী) জাত উদ্ভাবনের পথে যাত্রা করেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা),,বাংলাদেশ সুগার ক্রপ গবেষণাইনস্টিটিউট
(বিএসআরআই),বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই), অসংখ্য লাগসই ও টেকসই ফসলের জাত উদ্ভাবন করেছে এবং সেসব নতুন প্রযুক্তি সম্প্রসারণে সবিশেষ ভূমিকা পালন করেছে সরকাররি প্রতিষ্ঠান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে বাংলাদেশের কৃষি এখন অনকে উপরে অবস্থান করছে।বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও দুর্যোগ সহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনেও শীর্ষে বাংলাদেশের নাম।

তা ছাড়া ৮৫ লাখ টন আলু উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায়।স্বীকৃতিটি দিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। আলু উৎপাদন সাফল্যের এক বিস্ময়।

সাড়ে ১০ লাখ টন আম উৎপাদনের মাধ্যমে বিশ্বে ৯ম স্থান অর্জন করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ল্যাংড়া ও আম্রপলি আম এখন বিলেত যাচ্ছে। বিগত ২০১৫ সালে শ্রীলংকায় প্রথমবারের মতো দু’দফায় ২৫ মেট্রিক টন সরু চাল রফতানি করেছে বাংলাদেশ।একসময় ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ কথাটি বইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা বাস্তব। মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এ বছরের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য এসেছে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, পুষ্টি নিরাপত্তা এবং দরিদ্রতা নিরসনে প্রাণিসম্পদের অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ একটি সম্ভাবনাময় ও লাভজনক শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই সাথে উপযুক্ত প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং সম্প্রসারণ প্রাণিসম্পদ খাতকে আজ কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনের একটি অন্যতম প্রধান হাতিয়ারে পরিণত করেছে। দেশের বেকার জনগোষ্ঠী এবং নারীরা প্রাণিসম্পদ পালনে সম্পৃক্ত হয়ে আত্মকর্মসংস্থানের পথ খুঁজে পেয়েছে। দেশের বহু পরিবার আজ কেবল দুটি উন্নত জাতের গাভী অথবা স্বল্প পরিসরে ব্রয়লার/লেয়ার মুরগি পালন করে স্বাবলম্বিতার মুখ দেখেছে। এ ছাড়াও প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি ও নারীর ক্ষমতায়নে প্রাণিসম্পদ খাত বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে।

স্বাধীনাতাত্তোর বাংলাদেশে ঈর্ষণীয় উন্নতি হয়েছে কৃষি সেক্টরে আর কৃষির সবচে বেশী উন্নতি সাধিত হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন শাসনামলে সেজন্যে আওয়ামী লীগ সরকার স্বীকৃতি পেয়েছে কৃষি বান্ধব সরকার হিসেবে।

এতকিছুর পরেও এখনো কৃষি সেক্টরে কর্মরত কৃষিবিদ ডিপ্লোমা কৃষিবিদদের অনেক ন্যয্য দাবী অপূরণীয় রয়েছে।পদোন্নতির পথ এখনো সুগম নয়। আন্ত:ক্যাডার বৈষম্যের গ্যাড়াকলে পড়ে সকল যোগ্যতা থাকার পরেও পদোন্নতির পথ সুষমায়ন এবং কুসুমাস্তীর্ণ হচ্ছেনা ।ঠুনকো অজুহাতে এখনো অনেক দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তার মেধা ও মননশীলতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না। পদায়নের ক্ষেত্রে সকল যোগ্যতা দক্ষতা কখনো কখনো প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে ।এসব সমস্যার আশু সমাধান আবশ্যক।

আমাদের সবার মনে রাখা আবশ্যক: কৃষক কৃষিবিদ ও এদের সহযোগিদের সম্মিলিত প্রয়াশেই আজকের স্বয়ম্ভর বাংলাদেশ এবং দেশের মানুষকে খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হলে কৃষি প্রধান বাংলাদেশে কৃষি সেক্টরের সার্বিক উন্নতির কোন বিকল্প নেই। তাই এদের চলার পথকে কন্টকাকীর্ণ নয় কুসুমাস্তীর্ণ করার বিনম্র আহবান। আর এটা করতে পারলেই দেশে এগিয়ে যাতে তরতর করে। আমরা সেই সুদিনের প্রতিক্ষায়।

কৃষিবিদ ড. মো. আখতারুজ্জামান
(বিসিএস, ৮ম ব্যাচ)
জেলা বীজ প্রত্যয়ন অফিসার
মেহেরপুর।
ইমেইল:akhtar62bd@gmail.com

এস আই/ ২৮ আগস্ট , ২০১৭

image_print
Share.

Comments are closed.