২৫শে নভেম্বর, ২০১৭ ইং চলছে ক্রাইম, কিশোর বখাটেদের দখলে উত্তরা!

চলছে ক্রাইম, কিশোর বখাটেদের দখলে উত্তরা!

0

নিউজবিডি৭১ডটকম
ফাতেমী আহমেদ, অরণ্য আনোয়ার, ইদ্রিস আলমঃ গত শুক্রবার ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবিরকে উত্তরায় খেলার মাঠে কুপিয়ে হত্যা করে তারই প্রতিদ্বন্দ্বী আরেকটি গ্রুপের ছেলেরা। এ ঘটনায় গোটা এলাকাজুড়ে নেমে আসে শোকের মাতম। এমন ন্যাক্কার জনক ঘটনায় উত্তরার সব রাজনীতিবিদদের মাথায় হাত।

জানা গেছে, এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ট্রাস্ট কলেজের অষ্টম শ্রেণী পড়ুয়া এবং `নাইন স্টার` নামক গ্রুপের সদস্য ওই ছেলেটিকে হকিস্টিক দিয়ে পিটিয়ে এবং চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করে `ডিসকো গ্রুপ` নামের আরেকটি গ্রুপের ছেলেরা। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উত্তরার একটি স্থানীয় হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

চাঞ্চল্যকর এ হত্যার মূল ঘটনা জানতে অনুসন্ধানে নামে নিউজবিডি৭১ডটকম। অনুসন্ধানে বেড়িয়ে আসে উত্তরার ইতিহাসে না জানা ভয়ঙ্কর সব চ্যাঞ্চল্যকর তথ্য। উত্তরায় খেলার মাঠে প্রতিপক্ষের হাতে খুন হওয়া আদনান ছিলো একটি গ্রুপের সদস্য। যেখানে থাকার কথা ছিলো স্কুলের ব্যাগ সেখানে তারা পুজি করেছে গ্রুপিং আর সেই পুজির ফল দাঁড়ালো অকাল মৃত্যু যা মেনে নিতে কষ্ট হয় পরিবার, তার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও উত্তরাবাসীদের।

ঘটনার আরো ভিতরে গেলে বেরিয়ে আসে আরও কয়েকটি গ্রুপের নাম যা অনেকের আগে থাকেই জানা আবার অনেকেই বলে আমার শোনা নতুন নাম আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জাতীয়পার্টি এমন নাম শুনতাম আদনান হত্যার পর নানা গ্রুপের নাম শুনলাম।

১৩নং সেক্টরের এক বাসিন্দার সাথে কথা বলে জানা যায়, “সেখানে আগে থেকেই ঐ ছেলেদের পাঁচটি গ্রুপ আছে তারা অনেকে ঐ পাঁচ গ্রুপের সদস্য। তারা বেশিরভাগই উত্তরার নামকরা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাদের সবার বয়সই আনুমানিক ১৫-১৬ বছরের বঝতেই পারছেন স্কুল কলজের ছাত্র মাত্র কতই আর বয়স হবে।”

এই পাঁচ গ্রুপের মধ্যে মারামারি, অস্ত্র প্রদর্শন, মাদকসেবন, এলাকায় ভাগাভাগি, বাইক নিয়ে শো-ডাউন লেগেই থাকে। সবাই অনেক দামী বাইক চালায়। তাদের ভয়ে অনেকেই মুখ খুলছে না। এরা এলাকার কিশোর-কিশোরীদের জন্য রীতিমতো আতঙ্ক হয়ে উঠেছে।

উত্তরায় গড়ে উঠা উঠতি তরুণদের পাঁচটি গ্রুপের নাম “ডিসকো বয়েজ”,”নাইন ষ্টার”,”বিগ বয়েজ”,”পওয়ার বয়েজ” ও নাইন এম এম” গ্রুপ। এদের মধ্যে দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বের রেশ ধরেই অকালেই বিদায় নিতে হলো ১৪ বছরের কিশোর আদনানকে। আদনান ছিলো নাইন ষ্টার গ্রুপের সদস্য। ডিসকো গ্রুপের হাতে আদনানের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি পরিবারের।

ঘটনাস্থল উত্তরার ১৩ নং সেক্টরের ১৭ নম্বর রোড। যে বাড়ির সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে সেখানে গিয়েই চোখে পরে, আদনানের সেই লেগে থাকা রক্তের স্তুপ। জায়গাটি ইট দ্বারা ঘিরিয়ে রাখা হয়েছে।

কিশোর আদনান হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বাসিন্দা নিউজবিডি৭১কে জানান, ‘উত্তরা শুধু আমরাই চালাবো, আমাদের উপর কেউ নেই’ এমন মনোভাব নিয়ে “ডিসকো বয়েজ ও নাইন স্টার” নামের দুইটি গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের বলি হলো নাইন ষ্টার গ্রুপের সদস্য আদনান।

দুটি গ্রুপই নিয়ন্ত্রণ করে আসছে উত্তরার কয়েকটি সেক্টর। এই দুই গ্রুপের নেতারা মাত্র উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেছে। আর গ্রুপের অন্য সদস্যরা বেশিরভাগই উত্তরার সুনামধন্য প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করে রাজউক, মাইলস্টোন, ক্যামব্রিয়ান, উত্তরা হাইস্কুল, ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম, নবম, দশম এবং উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থী।

স্থানীয় আলম নামের একজন জানান, রাজু নামের ঐ ছেলেটি এলাকাতে তালাচাবি মেরামতের কাজ করতো সেই সুবাদে তালাচাবি রাজু নামেই পরিচিত। রাজুর বাবা ও ঐ কাজ করতো সেই রাজু নাকি আজ “নাইন স্টার” গ্রুপের লিডার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কলেজ শিক্ষার্থী বলেন, “এই গ্রুপের দ্বন্দ্ব মূলত উত্তরা এলাকাকে নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। দুটি গ্রুপই এলাকাতে খুবই তৎপর। তারা মাদকের আড্ডা বসায়, বিকট শব্দে বাইক চালায়, পার্টি করে, এবং স্কুল-কলেজের ছাত্রীদের নিয়মিত উত্যক্ত করে। তাদের অপকর্মের প্রতিবাদ করার মত কেউ নেই, প্রতিবাদ দুরের কথা, তাদের সাথে কথা বলার মত সাহস পায়না সাধারণ মানুষ।”

আদনান হত্যা বিচারে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাস্ট স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ বশির আহমেদ ভূঁইয়া নিউজবিডি৭১কে বলেন, `কলেজ কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। যেহেতু এই ঘটনায় বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জড়িয়ে পড়েছে। তাই, কোনো কলেজ আলাদাভাবে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত হবে না।`

এ ব্যাপারে উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলী হোসেন খান নিউজবিডি৭১কে বলেন, `কিশোর আদনান হত্যা মামলায় আসামিদের মধ্যে দুই জনকে আটক করা হয়েছে, তাদের মধ্যে একজন সাবেক জেলা জজের ছেলে। দুই আসামির একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং আরেকজনকে আগামীকাল জিজ্ঞাসাবাদে নেয়া হবে। একজনকে জিজ্ঞাসাবাদে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তার উপর ভিত্তি করে অন্য আসামিদের খোঁজা হচ্ছে। তবে, তদন্তের স্বার্থে তথ্য এখনই প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না।`

উত্তরা জোনের ডিসি বিধান ত্রিপুরা নিউজবিডি৭১কে বলেন, `গ্রুপিংকে কেন্দ্র করে ঘটা হতাহতের ঘটনায় নিহত আদনানের বাবা মামলার দ্রুত ও জোর তদন্তের দাবি করায় মামলা র‍্যাব-১ এর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। র‍্যাব যত দ্রুত সম্ভব তদন্ত শেষে পূর্ণ প্রতিবেদন পুলিশের কাছে জমা দেবে।`

মামলার অগ্রগতি জানতে র‍্যাব-১ এ একাধিকবার চেষ্টার পরও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

জানা যায়, কিশোর আদনান হত্যার পর আক্তারুজ্জামান ছোটন, নাঈমুর রহমান অনিক, সাদাফ জাকির, রায়হান আহম্মেদ সেতু, রবিউল ইসলাম, আহম্মেদ জিয়ান, নাজমুস সাকিব, নাফিজ মো. আলম ওরফে ডনের নামসহ আরও ১২ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন আদনানের বাবা কবির হোসেন।

নিউজবিডি৭১/আর/জানুয়ারি ০৯, ২০১৭

image_print
Share.

Comments are closed.