২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং সিভিল এভিয়েশনের কলঙ্ক হাবিব বিমানবন্দরের সিকিউরিটি গার্ড হয়েও তিনি কোটি টাকার মালিক! (পর্ব-১)

সিভিল এভিয়েশনের কলঙ্ক হাবিব

বিমানবন্দরের সিকিউরিটি গার্ড হয়েও তিনি কোটি টাকার মালিক! (পর্ব-১) 0

নিউজবিডি৭১ডটকম
অজিত সরকার, ফাতেমী আহমেদ, ইদ্রিস আলমঃ ‘নুন আনতে পান্তা ফুঁড়ায়’ কিংবা ‘দিন আনে দিন খায়’- এই দুটো বাংলা প্রবাদই বলে দেয় সাধারণ একজন ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী কিংবা সিকিউরিটি গার্ডের জীবনযাপনের মান। কিন্তু, একই পেশায় কর্মরত গুটিকয়েক কর্মচারী ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাঁস খেয়ে পাল্টে দিয়েছেন তাদের জীবনযাত্রার মান, হয়েছেন আঙুল ফুলে কলাগাছ।

তেমনই একজন অসৎ মানুষের নাম মো. হাবিবুর রহমান, যাকে সবাই হাবিব নামেই চেনে। পেশায় তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সিভিল এভিয়েশনের একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। যার কাজ বিমানবন্দর ও দেশ-বিদেশে আসা-যাওয়া করা যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

কিন্তু, নিজের কাজে হাবিব কতটুকু সফল তার হিসেব হয়তোবা কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। এছাড়া তার সম্পদের সঠিক হিসাবও নেই। বিমানবন্দরে চাকরির সুবাদে অবৈধ পথে আসা স্বর্ণ চোরাচালান, বিভিন্ন মূল্যবান পণ্যসামগ্রী লুট, যাত্রীদের লাগেজ চুরি, ঘুষের বিনিময়ে অনৈতিক কার্যকলাপ ইত্যাদির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন হাবিব।

হাবিবের বাবা মৃত সামছুদ্দিনও ছিলেন সিভিল এভিয়েশনের একজন ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী। বাবার মৃত্যুর সুবাদে পৈত্রিকসূত্রে চাকরি পেয়ে যান তিনি। প্রথম দিনে দৈন্যদশা থাকলেও কয়েক বছরের মধ্যেই অবৈধ সম্পদের পাহাড়চূড়ায় উঠে পড়েন তিনি।

হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ পেয়ে অনুসন্ধানে নামে নিউজবিডি৭১ডটকম। আর অনুসন্ধানেই বেড়িয়ে আসে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকার স্থানীয় অধিবাসী হাবিবের সম্পদের পরিমান ৫০ কোটি টাকারও বেশি। এছাড়া খিলক্ষেতের বেশ কিছু স্থানে নামে-বেনামে জায়গা-জমি কিনেছেন তিনি। সেসব জায়গার আর্থিকমূল্যও প্রায় ২ কোটি টাকা।

খিলক্ষেত থানাধীন ডুমনী ইউনিয়নের তলনা গ্রামে বসবাসকারী হাবিবের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তার বাবা মৃত সামছুদ্দিন দীর্ঘদিন সিভিল এভিয়েশনের চতুর্থ শ্রেণির করমচারী হিসেবে চাকরি করলেও, নিজেদের দৈন্যদশার খুব একটা উন্নতি করতে পারেননি। এরমধ্যেই তার মৃত্যু পরিবারকে যেন চারদিক থেকে নিঃশেষ করে দিচ্ছিল। ঠিক তখনই বিভিন্ন মহলের সুপারিশে বাবার চাকরিটা পেয়ে যান হাবিবুর রহমান। ফলে, বেঁচে থাকার আশাটুকু ফের আলোর মুখ দেখতে শুরু করে।

কিন্তু, কয়েক বছর যেতে না যেতেই আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার মতো ফুলে ফেঁপে ওঠে হাবিবের অর্থ-সম্পদ। পাল্টে যায় তাদের দৈন্যদশা।

হাবিবের কর্মস্থল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দীর্ঘদিন কয়েকজন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে নিউজবিডি৭১ডটকম। তারা জানান, হাবিব চাকরির শুরু থেকেই শাহজালাল বিমানবন্দরে সিকিউরিটি গার্ডের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তবে, কয়েকমাস আগে হঠাতই বেশ তাড়াহুড়ো করে তাকে অন্য কোনও বিমানবন্দরে ট্রান্সফার করা হয়।

কোথায় ট্রান্সফার করা হয়েছে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য দিতে পারেননি তারা। অভিযুক্ত হাবিব এবং তার পরিবারের কাছে জানতে চাইলে তারা কখনো যশোর বিমানবন্দর কিংবা কখনো চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের কথা বলে নিউজবিডি৭১কে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন।

তবে, সিভিল এভিয়েশন সূত্রে জানা যায়, অসৎ পথে সম্পদের পাহাড় গড়া সিকিউরিটি গার্ড হাবিবুর রহমান এখন কক্সবাজার অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরে কর্মরত আছেন।

হাবীবের আত্মীয় এবং স্থানীয় এক ব্যবসায়ী পরিচয় গোপন রাখার শর্তে জানান, খিলক্ষেত থানাধীন মস্তুল এলাকায় ৫০ লাখ টাকায় ৩ শতাংশ জমি এবং ৫ কাঠা একটা প্লট কিনেছেন হাবিব। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা। এছাড়া ডেলনা এলাকায় তার স্ত্রী শামীমা আক্তারের নামেও জমি কিনেছেন তিনি।

বিশ্বস্ত সূত্রে আরও জানা যায় যে, হাবিব কর্মস্থলে থাকার কারণে নিজে এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন না। তাই, তিনি তার সমন্ধিকে (স্ত্রী শামীমা আক্তারের ভাই) দিয়ে সকল কুকর্ম ও আর্থিক লেনদেন করিয়ে থাকেন। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে বিকাশ নাম্বার ব্যবহার করা হয় বলেও জানা যায়।

হাবিবের সব কুকর্মের সাক্ষী তার সমন্ধি ইসমাইলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, প্রথমে তিনি সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে, সঠিক তথ্য ও প্রমাণের কথা বললে পরবর্তীতে তিনি নিউজবিডি৭১ডটকমের দুই প্রতিবেদককে বিভিন্নভাবে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখিয়ে এসব থেকে দূরে থাকতে বলেন।

তবে, ইসমাইলের হুমকিতে ভয় না পেয়ে পরবর্তীতে বিভিন্নভাবে তার সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি তার ভগ্নিপতি হাবিব এবং তার কুকর্ম সম্পর্কে ফোনে কথা বলতে কিংবা দেখা করতে রাজী হননি।

আরও বিস্তারিত অনুসন্ধানের জন্য হাবিবের বাড়ি খিলক্ষেত থানার তলনা গ্রামে যায় নিউজবিডি৭১ডটকম। সেখানে পরিচয় গোপন করে স্থানীয় এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছে হাবিব ও তার আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে- ঐ ব্যবসায়ীও নিজের পরিচয় না দেয়ার শর্তে জানান, হাবিবের পেশা অনুযায়ী তার মাসিক বেতন অল্প হলেও তার উপরি আয় বেশ ভালো।

এছাড়া তিনি যে খিলক্ষেত থানার বহুমূল্য তিনশ ফিট রাস্তা সংলগ্ন মস্তুল এলাকায় ৫ কাঠা জমি কিনেছেন তাও সত্যি বলে জানান ঐ ব্যবসায়ী। যদিও হাবিবের পারিবারিক অবস্থার দিকে তাকালে এসব তথ্য সাজানো গল্প ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না। তলনা গ্রামে হাবিবের নিজের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ ঘর, টিনের দেয়ালে মরিচা ধরে ছিদ্র হয়ে আছে। এছাড়া বাড়ির মেঝে থেকে খসে পড়ছে ইট-বালু-সিমেন্ট।

হাবিবের অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং অবৈধ সম্পদের বিষয়ে খোঁজখবর নিতে তার চাচা ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা মুমিনুদ্দিন এবং আরও দুই মুক্তিযোদ্ধা আহমদ আলী ও আক্তার হোসেনের সঙ্গে কথা বলে নিউজবিডি৭১ডটকম। তবে, নিজের আপন ভাতিজা হাবিব সম্পর্কে কোনও তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান চাচা মুমিনুদ্দিন। অন্য দুই প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধাও কিছু বলতে চাননি।

হাবিবের অবৈধ সম্পদ এবং বিপূল পরিমাণ কালো টাকার তথ্য জানিয়ে এর আগে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে পিআইডিভুক্ত কয়েকটি প্রিন্ট মিডিয়া। তবে, এতে টনক নড়েনি অপরাধী হাবিব কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের। এর সূত্র ধরেই অনুসন্ধানে নামে নিউজবিডি৭১ডটকম।

চলছে অনুসন্ধান! হাবিবের অবৈধ সম্পদ সম্পর্কে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাবেন- দ্বিতীয় পর্বে…

নিউজবিডি৭১/আর/এমআর/জানুয়ারি ০৫, ২০১৭

image_print
Share.

Comments are closed.