২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টার নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে চলছে সেবার নামে বাণিজ্য (দ্বিতীয় পর্ব)

বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টার

নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে চলছে সেবার নামে বাণিজ্য (দ্বিতীয় পর্ব) 0

নিউজবিডি৭১ডটকম
অজিত সরকারঃ রাজধানীতে স্বাস্থ্যসেবা রুপ নিয়েছে মনিহারী দোকানের মত। যেন ট্রেড লাইসেন্স নিলেই ব্যবসা করা যায়। মজার বিষয় অনেক প্রতিষ্ঠানের এ লাইসেন্সটি আছে কিনা সন্দেহ। বাইরের ডিজিটালাইজেশন দেখে বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনষ্টিক সেন্টার মনে হলেও কাজে যেন হাতুড়ে ডাক্তারের দাওয়াখানা।

রাজধানীর অলিতে-গলিতে কিংবা আবাসিক এলাকায় এমন দাওয়াখানার সংখ্যা কয়েক`শ। আর এইসব শত শত অবৈধ ক্লিনিক, ডায়াগনষ্টিক সেন্টার, বেসরকারি হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি, সেবার নামে বাণিজ্য, দালালের মাধ্যমে প্রতারণা এবং অসহায় ও দরিদ্র রোগীদের নিঃস্ব করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়াসহ হাজারও অভিযোগ নিয়েই নিউজবিডি৭১ডটকমের এ অনুসন্ধান।

গতকাল প্রথম পর্বের প্রতিবেদনে আপনারা দেখেছিলেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বেসরকারি এলিট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রতারণা-বাণিজ্য। আজ দ্বিতীয় পর্বে দেখুন- কিভাবে দালালের মাধ্যমে অসহায় রোগীদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একই এলাকার নিউ ওয়েলকেয়ার হাসপাতাল।

মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে অবস্থিত নিউ ওয়েলকেয়ার হাসপাতালটিতে কয়েকমাস আগে অভিযান চালিয়ে জরিমানাসহ প্রতিষ্ঠানটিকে সিলগালা করে ভ্রাম্যমান আদালত ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবারও নতুন নামে কার্যক্রম শুরু করে এ হাসপাতালটি।

নিউজবিডি৭১-এর অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির সাইনবোর্ডে অনেক নামী দামী ডাক্তারের নাম লেখা থাকলেও ভালো ডাক্তার বলতে এখানে তেমন কেউ নেই। এছাড়া দর কষাকষি করে রোগীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে মোটা অংকের টাকা। আর প্রয়োজনের বাইরেও লেখা হচ্ছে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরিক্ষা।

হাসপাতালটির ভেতরে প্রবেশ করলে মনে হবে ভুতুড়ে পরিবেশ। চারদিকে অপরিষ্কার আর স্যাঁতসেঁতে অবস্থা। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির ভিতরে ও বাইরে দেখা গেছে অসংখ্য দালালের আনাগোনা। যারা এক একটা রোগী এনে দেওয়ার বিনিময়ে পাচ্ছে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি এ হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী মোঃ দেলোয়ার হোসেন নিউজবিডি৭১কে জানান, নিউ ওয়েলকেয়ার হাসপাতালটি আগে শুধু ওয়েলকেয়ার হাসপাতাল নামেই ছিল। ভ্রাম্যমাণ আদালত সিলগালা করার পর সেটি `নিউ ওয়েলকেয়ার হাসপাতাল` এই নতুন নামে লাইসেন্স নেওয়া হয়।

ওটি মেশিন না থাকার কারণে তাদের এই নতুন নিউ ওয়েলকেয়ার হাসপাতালটিকেও জরিমানাও করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দালালরা বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখিয়ে রোগীদেরকে নিয়ে যাচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানে। আর ডাক্তাররা প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে রোগীদের বিভিন্ন ঔষধ লিখে যা রোগীদের জন্য অনেক ব্যয়বহুল। এছাড়া, মোটা অংকের টাকার আশায় রোগীদেরকে এসব হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়ে কয়েকদিন চিকিৎসা নেওয়ার কথাও বলেন ডাক্তাররা।

সাদ্দাম হোসেন নামে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জানান, বেসরকারী হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারগুলোতে টাকার বিনিময়ে ভালো ও উন্নতমানের চিকিৎসা পাওয়ার আশায় রোগী ও তাদের আত্মীয়-স্বজনরা এখানে আসে। কিন্তু, কোন কোন হাসপাতালের চিকিৎসার মান উন্নত হলেও অধিকাংশ বেসরকারী হাসপাতালের চিকিৎসার মান নিম্নমানের।

ভ্রাম্যমাণ আদালত ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এসব প্রতিষ্ঠানে কয়েকমাস পর পর অভিযান চালিয়ে লাখ লাখ টাকা জরিমানা, জেল ও সিলগালা করলেও টনক নড়ছেনা প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তিদের। উল্টো প্রতিষ্ঠানের নাম পাল্টে নতুন নামে কার্যক্রম চালাচ্ছে তারা।

কেবল মোহাম্মদপুরের বারর রোড ও খিলজী রোডেই রয়েছে অসংখ্য হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টার। এরমধ্যে এলিট ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টার, নিউ ওয়েলকেয়ার হাসপাতাল, জনসেবা নার্সিং হোম এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টার, সেবিকা জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টার, মক্কা মদিনা জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টার ইত্যাদিতে সেবার নামে বেশি মাত্রায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

নিউজবিডি৭১-এর অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর হাসপাতাল পাড়া নামে পরিচিত শেরে বাংলা নগরের সব হাসপাতালেই বিদ্যমান একটি সক্রিয় দালালচক্র। যারা ঢাকার বাইরে থেকে সরকারি হাসপাতালে আসা রোগীদের উন্নত ও মানসম্মত চিকিৎসার কথা বলে তাদের নিয়ে যাচ্ছে এসব ভুয়া ও মানহীন প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে।

এ প্রসঙ্গে নিউজবিডি৭১ডটকমের সঙ্গে কথা হয় বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের। তারা জানান, একসময় বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের নার্স, আয়া কিংবা ওয়ার্ডবয় এমনকি হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লোকজন এখন নিজেরাই ডায়াগনষ্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক চালু করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা সরকারি হাসপাতালের কিছু কর্মচারী ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় রোগীদের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে উন্নত চিকিৎসার কথা বলে এসব ভুয়া প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাচ্ছে।

আর এ সকল ভুয়া প্রতিষ্ঠানগুলো কমিশনের ভিত্তিতে কিছু দালালও নিয়োগ দিয়েছে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে। ওই দালালরা কমিশনের লোভে দৈনিক একজন রোগী ভাগিয়ে নিতে পারলেই পাচ্ছে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা। এভাবে শেরে বাংলা নগরের সরকারি হাসপাতালগুলোতে কাজ করছে পাঁচ শতাধিক দালাল।

এ সম্পর্কে শেরে বাংলা নগরের সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ উত্তম কুমার বড়ুয়া নিউজবিডি৭১কে জানান, সম্প্রতি বিভিন্ন বেসরকারী হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারগুলোতে অনিয়ম আর অভিযোগ বেড়ে যাওয়ায় এগুলোকে কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ভ্রাম্যমাণ আদালত, বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে জরিমানা ও বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

এক শ্রেণীর দালাল বিভিন্ন সরকারী হাসপাতালের স্টাফদের সাথে লিয়াজোঁ করে অনেক রোগীকে বেসরকারী ক্লিনিক, ডায়াগনষ্টিক ও হাসপাতালগুলোর দিকে নিয়ে যাচ্ছে- এমন অভিযোগ শুনে ডাঃ উত্তম কুমার জানান, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কোন স্টাফের সাথে কোন দালালের লিয়াজোঁ নেই। আর যেসব দালালরা সরকারী হাসপাতালের রোগী নিয়ে টানাটানি করেন তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কঠোর পদক্ষেপ নেবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডাঃ এ, কে, এম সাইদুর রহমান নিউজবিডি৭১কে জানান, যেসব ক্লিনিক, ডায়াগনষ্টিক সেন্টার ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে অনিয়ম-অভিযোগ আসবে সে সকল প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে জরিমানাসহ বিভিন্ন আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সামনের দিকে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যৌথ পরিচালনায় এ সকল অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

যত্রতত্র গড়ে ওঠা ওইসব ক্লিনিক, ডায়াগনষ্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে নেই কোনো প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক। ভুয়া চিকিৎসক, যারা দীর্ঘদিন হাসপাতালের চিকিৎসকদের পিয়ন ও সার্জারি ডিপার্টমেন্টে ওয়ার্ড বয় হিসেবে কাজ করতো তারাই এখন বিভিন্ন জটিল ও কঠিন অপারেশন থেকে শুরু করে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা করে আসছে। আর এসব ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে অনেকেই অকালে প্রাণ হারাচ্ছে।

এসব প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের অধিকাংশই মেনে চলছেনা কোন নিয়ম-কানুন। যেমন: চেম্বারের রক্ষণাবেক্ষণ, নিবন্ধনের রক্ষণাবেক্ষণ, চার্জ ও ফি প্রদর্শন, লাইসেন্সযুক্ত প্রাইভেট ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি বিষয়ে তারা সচেতন নয়। সরকারী বিভিন্ন নিয়ম-কানুন ও নীতিমালা থাকলেও এসবের কোন তোয়াক্কা করছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

১৯৮২ সালে প্রণীত সকল হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের জন্য জারীকৃত এক অধ্যাদেশে বলা হয়েছে- একটি প্রাইভেট ক্লিনিক স্থাপনের জন্য কোনো লাইসেন্স ইস্যু করা হইবে না যদি না ক্লিনিকটি নিম্নলিখিত শতাবলী পূরণ করে-
* রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশের সঙ্গে সঠিক বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
* প্রতিটি রোগীর জন্য মেঝে স্থান অন্তত আশি বর্গফুট হতে হবে।
* ক্লিনিকটিতে অবশ্যই একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অপারেশন থিয়েটার থাকতে হবে।
* তফসিলে উল্লেখিত সব ধরনের উপকরণ থাকতে হবে।
* ক্লিনিকটিতে জীবন বাঁচান এবং অপরিহার্য ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
* ক্লিনিকটিতে অপারেশন, চিকিৎসা এবং রোগীর তত্ত্বাবধানের জন্য বিশেষজ্ঞরা থাকবেন ইত্যাদি।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের সাইনবোর্ডে বড় বড় ডাক্তারের নাম লেখা থাকলেও জানা গিয়েছে এসব ডাক্তাররা ওই সকল ক্লিনিকে কোনদিনও যাননি। বরং কম্পাউন্ডার, টেকনেশিয়ান ও ভুয়া হাতুড়ে চিকিৎসকরা সেবার নামে দিনের পর দিন প্রতারণা করে যাচ্ছে।

এছাড়া হাসপাতাল ও ক্লিনিকে পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকা, নার্সের কাউন্সেলিং সার্টিফিকেট না থাকা, ড্রাগ লাইসেন্স না থাকা, নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে হাসপাতাল পরিচালনা করা, বিভিন্ন রোগের টেস্টে অত্যন্ত নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার, রেডিওলজিস্ট ও সনোলজিস্ট না থাকা, লাইসেন্সবিহীন অপারেশন থিয়েটার পরিচালনা করা, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ল্যাব টেকনিশিয়ান না থাকা, অতিরিক্ত বেডের ব্যবস্থা করে গাদাগাদি করে রোগী রাখা এবং হালনাগাদ লাইসেন্স ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন মেয়াদে জরিমানা ও কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

এত কিছুর পরেও শিক্ষা হচ্ছে না মানহীন এসকল বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের মালিকদের। দিনের পর দিন তারা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতারণা-বাণিজ্য, নিঃস্ব করে চলেছে অসহায় ও দরিদ্র রোগীদের। এসবের কি আদৌ শেষ আছে? প্রশ্নটা থেকেই যায়……

নিউজবিডি৭১/আর/০৪ নভেম্বর, ২০১৬

image_print
Share.

Comments are closed.